আফ্রিদির বউয়ের ডায়েরি

Updated By: Mar 22, 2016, 02:03 PM IST
আফ্রিদির বউয়ের ডায়েরি

পার্থ প্রতিম চন্দ্র

পাকিস্তানের এক গ্রামে বসে এমন এক মহিলার লেখা ডায়েরি যা আজ সবার পড়া দরকার। তাই ব্লগে আমার নয় ওই মেয়েটার লেখাটাই প্রকাশ করলাম।

২১ মার্চ, দুপুর ২টো, পেশোয়ার

এখন আমি বাড়ির বড় জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। মন খারাপ হলে আমি এমনটাই করে থাকি। মনটা তো আসলে ভাল থাকার কথা। কটা দিন পরই আমার শাদি। আমার হবু বরের টাইটেলটা শুনলেই অনেকেই এখন আমায় জিজ্ঞাসা করে শাহিদ ভাইয়া নাকি রে! আমি শুধু হেসে উড়িয়ে দিই। আমার বরের নাম মালিক আফ্রিদি। আমি কটা দিন পরেই অ্যাবোটাবাদে চলে যাব। ওখানেই আমার হবু বরের বাড়ি। শুনেছি ও মস্ত বড় সেনা অফিসার। ওর মত সুপুরুষ আমাদের তল্লাটে নেই। না, না আমি খামোকা আমার বরের প্রশংসা করছি না। প্রশংসা করতে আমার ভাল লাগে না। ওটা আমার ধাতে নেই। তা ছাড়া আমার হবু বরের কথা আমার একদম ভাল লাগে না। এই তো শনিবার যেদিন ইডেনে বিশ্বকাপে ভারতের কাছে আমরা হারলাম, সেদিন ও ফোন করে বলেছিল, বেশ হয়েছে, ব্যাটাদের হাতগুলো কেটে নিতে হয়।
 
আমার রাগ হয়েছিল খুব। কিন্তু আমাদের তল্লাটে মেয়েদের রাগ থাকতে নেই, ইচ্ছা থাকতে নেই, শখও থাকতে নেই। আমার বয়স ১৬। এ বয়সে শাদি করার কোনও ইচ্ছা আমার নেই।  আমার ভাললাগে উড়তে। কিন্তু এসব এখানে চলে না। এখনই দেখতে পাচ্ছি মে মাসে অ্যাবোটাবাদের একটা ঘরে আমি বন্দি। বন্দি শব্দটায় আপত্তি উঠুক, তাতে আমার যায় আসে না। কারণ আমি জানি শাদিতে কবুল হ্যায়, কবুল হ্যায়, কবুল হ্যায় বলাটা আমার কাছে বন্দি হওয়ার মন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এখানে চুপি চুপি একটা কথা লিখে রাখি। শাদির সন্ধ্যায় আমি কবুল হ্যায় কথাটা তিনবার বলব না। শেষের কবুল হ্যায়-টা বলব কাবিল হ্যায়। কাবিল-এর সঙ্গে কবুলের ফারাকটা ওরা ধরতে পারবে না। আমাদের এখানে মেয়েরা প্রতিবাদ করতে পারে না। আমার ক্ষেত্রে তো প্রশ্নই নেই। কাবিল শব্দেই আমার সব প্রতিবাদ লুকিয়ে থাকবে। এটুকু লিখে আমার নিজেকে কেমন বলিউড সিনেমার নায়িকাদের মত ন্যাকান্যাকা মনে হচ্ছে। সিনেমার নায়িকাদের মত আমায় কিন্তু কেউ জোর করে বিয়ে দিচ্ছে না। আমার বিয়েটা হচ্ছে, কারণ হতে হবে বলে, নিয়ম বলে। আসলে আমাদের জীবন নিয়ে সুন্দর সিনেমা হয়। কিন্তু জীবনটা সিনেমার মত সুন্দর হয় না।

এতক্ষণ বুঝতে পারছি, আমি যা লিখতে চাইছি তা কিছুই লিখে উঠতে পারিনি। আমার মনখারাপের কারণটা লিখে বোঝাতে পারব না। তবু একটু লেখাটা গোছানোর চেষ্টা করছি। আমার মন খারাপের শুরুটা শনিবার রাত থেকে। তার আগে আমি বেশ ছিলাম। এই তো গত সপ্তাহে বাবা একটা নতুন টিভি কেনে। আমার শাদির আগে ধার করে টিভিটা কিনে বাবা অনেকটা ঝুঁকি নিয়েছেন। কিন্তু ইডেনে পাকিস্তান-ভারতের ম্যাচের আগে এসব আমাদের মাথায় ছিল না। আমাদের মহল্লায় একটা বড় জাতীয় পতাকা টাঙানো হয়েছিল। আমার ভাই এক হাত নিয়েই ওই পতাকাটা টাঙিয়েছিল। গত মাসে আমাদের পাশের বাজারে একটা বড় বিস্ফোরণে ভাইয়ের হাতটা উড়ে যায়। অবশ্য ওতে ওকে লাকিই বলতে হবে। কারণ, ও ছাড়া আমাদের পাড়ার সবাই যারা সেদিন বাজারে ছিল মারা গিয়েছে। আমাদের এখানে বিস্ফোরণটা নতুন কিছু নয়। বোমার শব্দটা আমার বাবার ফোনের রিংটোনের চেয়ে একটু কম শোনা যায়। কী জানি এসব কবে বন্ধ হবে। নাকি আমাদের দেশটায় শুধু এসবই চলবে। যাই হোক পতাকা টাঙানোর কথায় আসি। সেদিন ভাইয়ের সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমি পতাকার দড়িটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেখানেই পরিচয় হল ইরফানের সঙ্গে। ইরফান খুব ভদ্র ছেলে। বাকিদের মত হা করে চেয়ে থাকে না। ওর ব্যক্তিত্বটা সবার ভিড়ে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।   

ইরফান সেদিন বলেছিল, কি খেলা দেখবে তো, কী হবে মনে হয়? আমি লাজুক স্বরে বলেছিলাম, ইনশাল্লাহ পাকিস্তান জিতবে। ও বলেছিল, সেটা তো আমরা সবাই চাই। কিন্তু মনে রেখো ম্যাচ জেতা আমাদের মত সমর্থকদের হাত থাকে না। কিন্তু হারার ক্ষেত্রে থাকে। আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, কেন? ছোট চেহারার ওই ছেলেটার মুখ থেকে উত্তর এসেছিল, হারলে সমর্থকরাই দলের সবাইকে আগলে রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না। হয় না বলেই আমাদের দেশের খেলোয়াড়রা বড় মঞ্চে এখন চোক করে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়েছিলাম। ছোট থেকে তো এটাই দেখে আসছি, শুনে আসছি। ম্যাচ জিতলে ক্রিকেটারদের জয়গান করো, আর হেরে গেলে জুতো মারো। আমাদের এখানে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা কথা বলতে পারে না। তাই ইরফানের সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি। কিন্তু ওর কথা আমার এতটাই ভাল লেগেছিল যে কথাটা আমার এখনও কানে বাজে। যে মানুষটা এ কথা বলতে পারে, সে ভালবাসতে পারে, সে মর্যাদা দিতে জানে। তাকে ভালবাসতে হয়।

শনিবার ইরফান আমাদের বাড়িতে নতুন টিভিতে খেলা দেখতে এসেছিল। আমাদের বাড়িতে জনা তিরিশেক মানুষ খেলা দেখছিল। শফকত সাহাবের গলায় পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের সময় আমরা সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি পরিষ্কার দেখছিলাম ইরফানের চোখ কান্নায় ভেসে গেছে। বলতে লজ্জা লাগলেও এটা ঠিক ম্যাচের মাঝে আমার চোখটা বারবার ওর দিকে চলে যাচ্ছিল। দেখলাম ও শুধু দেশ নয় খেলাটাকেও ভালবাসে।  

ইডেনে যখন সামির বলে ওদের পরপর দুটো উইকেট পড়ে গেল তখন আমরা আনন্দে নাচছি। ইরফানের দিকে তাকালাম, ও হাতটা মুঠো করে হাওয়ায় ছুঁড়ল। তারপর যত সময় গেল আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল। একেবারে নিঝুম ঘরে ইরফান শুধু একবার বলল, বিরাটের খেলাটা কিন্তু দারুণ লাগছে। ম্যাচের শেষের ওভারটা আর দেখা হয়নি। তার আগেই টিভি বন্ধ করে দিতে হল। কারণ মহল্লার এক চাচা এসে বলল, আধা ঘণ্টার মধ্যে বাড়ির পুরুষরা যেন মোড়ের মাথায় এসে দাঁড়ায়। ইরফান প্রতিবাদ করে বলেছিল, খেলাটা আগে শেষ হোক। সেই দুষ্টু চাচাটা ইরফানকে ধরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।

সেদিনের বাকি কথাগুলো আর লিখতে ভাললাগছে না। আমাদের নতুন টিভিটা ওরা মহল্লার রাস্তায় নিয়ে ভেঙে দিয়েছিল। শাহিদ ভাইয়ের পুতুল পুড়িয়েছিল। তার চেয়েও দুঃখের কথা হল ওরা ইরফানের পা দুটো ভেঙে দিয়েছিল। ইরফানের বক্তব্য ছিল, ও পুতুল পোড়ানো, টিভি ভাঙায় নেই। দেশবিরোধী বলে ওকে এইরকমই শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। চিকিত্‍সার জন্য ইরফানকে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওর পরিবারের লোক বলে গেছে ওরা আর কোনওদিন এখানে আসবে না। মানে আমার আর কোনওদিন ইরফানের সঙ্গে কথা হবে না।

এই তো আমি দেখতে পাচ্ছি অ্যাবোটাবাদে বড় একটা ঘরে আমি বিশ্বকাপের খেলা দেখছি। আমার বর বসে উত্তেজনায় হাত পা ছুঁড়ছে। আর বলছে এবার মওকায় পেয়েছি এবার আমরা দেখে নেবো। মওকা মওকা বিজ্ঞাপনটা আমার একদম ভাল লাগে না। কারণ ওটা দেখলেই আমার বাবার কথা মনে পড়ে যায়। বিজ্ঞাপনে পাকিস্তানের জার্সি পড়া লোকটার মতই আমার বাবার অবস্থা। আল্লাহার কাছে একটাই দোয়া, দয়া করে এবার অন্তত আমাদের জিততে দাও। আর কত টিভি, কত পা ভাঙলে তবে তুমি আমাদের দিকে তাকাবে বলতে পারো!

আজ আর লিখতে ভাললাগছে না। ফোনটা এর মধ্যে দু বার বেজেছে। ওটা ওর ফোন। জানি আমায় এর জন্য বকা খেতে হবে। তবে ওসব আর ভাবতে ইচ্ছা করছে না। আমার মন ভাল নেই। মন ভাল না থাকলে আমি শুধু আকাশের দিকেই তাকিয়ে থাকি। আর কেউ না বুঝুকু আল্লাহ একবার আমার মনের কথা শুনবেন।