তোমাদের সবুজ পিচ, আমাদের ঘূর্ণি উইকেট, এ যেন সেই বক আর শেয়ালের গল্প

আফ্রিকার সিংহরা ভারত ভ্রমণে এসেছেন।

Updated By: Dec 4, 2015, 07:14 PM IST
তোমাদের সবুজ পিচ, আমাদের ঘূর্ণি উইকেট, এ যেন সেই বক আর শেয়ালের গল্প

ওয়েব ডেস্ক: আফ্রিকার সিংহরা ভারত ভ্রমণে এসেছেন।
২ অক্টোবর, প্রথম গেলেন হিমাচল প্রদেশ। জিতলেন। (দক্ষিণ আফ্রিকা জয়ী ৭ উইকেটে)

৫ অক্টোবর, কটক। আবারও জিতলেন। (দক্ষিণ আফ্রিকা জয়ী ৬ উইকেটে)
 
৮ অক্টোবর, এলেন কলকাতায়। খেলাটা হল না। খেলার ফলাফল- ভারত নয়, দক্ষিণ আফ্রিকা নয় '১০ উইকেটে জয়ী বৃষ্টি'।  

১১ অক্টোবর, কানপুর। জয়ী আফ্রিকার সিংহরা। (৫ রানে জয়ী দক্ষিণ আফ্রিকা)

১৪ অক্টোবর, ইন্দোরে আফ্রিকার সিংহরা। এবার ওরা ধরাশায়ী। ২২ রানে 'চমকে' দিল ভারতীয়রা।

১৮ অক্টোবর, রাজকোট। জয়ী আফ্রিকার সিংহরা। (১৮ রানে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়)

২২ অক্টোবর, চেন্নাই। জয়ী ভারত, ৩৫ রানে।

২৫ অক্টোবর, মুম্বই। একেবারে ছিঁড়ে খাওয়া যাকে বলে। দক্ষিণ আফ্রিকা ৪ উইকেটে ৪৩৮, ভারত ২২৪ অল আউট। বলে রাখা ভাল, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৪৩৮ রান ভারতের বিরুদ্ধে কোনও বিপক্ষ দল করল, তাও আবার ঘরের মাঠে। শুধু ভারত নয় বিশ্ব ক্রিকেটে ৫০ ওভারের খেলায় ২১৪ রানে জয়ের নজির আর কটাই বা আছে?

গোটা ওয়ানডে রেজাল্ট: টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-০। ৫০ ওভারের সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩- ভারত ২। এই দুই ধরনের ক্রিকেটেই ভারতের ক্যাপ্টেন ছিলেন ধোনি। বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র 'সিংহ' ধোনি।

গোটা সিরিজের দুই ফরম্যাটে আফ্রিকার সিংহদের দাপটটা বড্ড বেশিই ছিল। বাকি রইল টেস্ট। বিল্পবের মাসে একটা ক্রিকেট বিপ্লব চাইছিল গোটা ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীরা। ক্যাপ্টেন বিরাটের এমনিই নাম ডাক আছে তিনি বড্ড 'অ্যাগ্রেসিভ'। সিংহদের জবাব দিতে হলে আগ্রাসী হতে হবে এটা স্বাভাবিক কথাই। ভাবতে বসল গোটা ম্যানেজমেন্ট। কী করা যায়, কী করা যায়? উপায়, ঘূর্ণি উইকেট বানাও। একটু ভয় যে ছিল না, তা নয়, ইংল্যান্ডের মন্টি পানেসারের কথা মনে আছে তো? একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিল গোটা ভারতকে। ২০১২, ভারত ইংল্যান্ডে তো হেরেছিল ০-৪ এ। তারপর আবার ভারতের ইংল্যান্ড সফর। লর্ডসে তেরঙ্গা উড়িয়ে ১-৩ হেরে ফিরল দেশ। শোধ তুলতে ঘুর্ণি টোটকা, কিন্তু বুমেরাং। তাই এবার ভয়টা কিঞ্চিত ছিলই। তবে মাথায় ছিল ইমরান তাহির ছাড়া ভারতের টার্নিং উইকেটে বিশেষ কেউ এদেশের উইকেটে খেলেননি। শাস্ত্রীজির আজ্ঞা আর অবজ্ঞা হয় কী করে? বিরাটও মরিয়া, জিততেই হবে। অগত্যা, বানাও এমন উইকেট যেখানে ক্রিকেট বল দিয়ে লাট্টু খেলা হবে। ভন ভন করে ঘুরবে বল। হলও তাই।

৫ নভেম্বর। প্রথম টেস্ট। মোহালি। ভারত ১০৮ রানে জয়ী। উল্লেখ্য একটা দলও এক ইনিংসেও ৮০ ওভার খেলতে পারেনি। যার মানে একদিনও ব্যাট করতে পারছে না কোনও দল। একবার নয়। চারটে ইনিংসেই একই অবস্থা!

চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম, বেঙ্গালুরু। ১৪ নভেম্বর খেলা শুরুর প্রথম দিনেই ৫৯ ওভারে গুটিয়ে যায় আফ্রিকা। তারপর খেলাটা আর গড়ায়নি, মাঠে গড়াগড়ি খেয়েছে বালতি বালতি জল। ম্যাচে 'জয়ী বৃষ্টি'।

তৃতীয় টেস্ট। নাগপুর। সে এক উইকেট। বাপরে! এত ফাটল বোধহয় বৃষ্টির দিনে পিচ বেরিয়ে আসা রাস্তাতেও থাকেনা। ভারতের অশ্বিন আর জাডেজা সঙ্গে অমিত মিশ্র, সিংহ নাচানোর আনন্দ কী আর বলে বোঝানো যায়? ভারত সিরিজ জয়ী। বিরাট যেন 'I am a hunter'।

শেষ ম্যাচ দিল্লির কোটলা। আবারও ঘূর্ণি। প্যাঁচে পড়েছিলেন নিজেরাই। তাও বাচালেন অজিঙ্কা রাহানে। গোটা টেস্ট সিরিজে একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করলেন। দ্বিতীয় দিন গড়াতে না গড়াতেই দক্ষিণ আফ্রিকা ১২১ রানে অল আউট। এই ম্যাচও ভারত জিতছে। সেক্ষেত্রে দেশের মাটিতে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতবে কোহলির ভারত।

এখন প্রশ্ন, এই জয়টা কার? ভারতীয় দলের না পিচ কিউরেটোরদের? নাকি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের?

এমন কখনও হয়েছে, আপনি পরীক্ষা দিতে গিয়েছেন নিজের তৈরি করা প্রশ্নপত্রে? এমনটা হতে পারে, প্রশ্নগুলোর সবটাই আপনার জানা। বা কিছু জানা আর বাকিটা টুকে। কিন্তু এত পরীক্ষা দেওয়া আর না দেওয়া, একই ব্যাপার! জিতব পিচের জোরে? খেলার জোরে নয়! একটা ইনিংস খুঁজে বার করতে পারবেন যেটা স্মরণীয় করে রাখবে? এটা টেস্ট ক্রিকেট? ৫ দিন গ্যালারিটা ভরবে গ্যালারি শো করে? না কি ক্রিকেট খেলে? প্রশ্ন উঠতেই পারে, বাইরের মাটিতে ভারতকে সবুজ পিচে খেলতে হয়। আচ্ছা, ভারত কি সবুজ পিচে এর আগে ভাল কখনও খেলেনি? ১৯৮৩ -তে বিশ্বজয়ের গল্পটা লিখতে গেলেও তো লর্ডসের কথাই লিখতে হয়। ফাস্ট উইকেট। অনেক পর, সেখানেও মহারাজের জার্সি ওড়ানো। জার্সিটা পতাকা হয়ে গিয়েছিল ওই জোড়টায়, সবুজ উইকেটে ৩১৯ চেস করে জেতাটা বেঙ্গল টাইগারটাই পারে। যদি ওটা ভাল ক্রিকেটের নমুনা হয়ে থাকে তাহলে, এটা কি হচ্ছে? নাচানোর এত শখ থাকলে ২২ গজে কেন? ম্যাচ জেতার পর পাঁচ তারা হোটেলেও তো সেটা করা যায়। মায়াবি আলোয় হোটেলের নাইট পার্টি আর সবুজ মাঠের ২২ গজটা এক হয়ে গেলে ক্রিকেটটার যে বড্ড লাগবে। তাই জয়ের আনন্দের দিনেও একটু ভেবে দেখবেন। অনেক কিছু হারিয়ে ফেললেন না তো!কারণ, দিনের শেষে তো সবুজ পিচ, পাটা উইকেট, এ যেন সেই বক আর শেয়ালের গল্প। তোর পাড়ায় তুই মারবি, আমার পাড়ায় আমি। বলি সব তো হল, বক আর শেয়ালরাই কি থাকবে! ক্রিকেটটাকেও তো বাঁচাতে হবে।