প্রত্যাশার সিন্দুকে লুঠ হয়ে গেল

আগের ছবি উড়ান উড়ে গিয়েছিল কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। দর্শকের, বিশেষত বাঙালি দর্শকের প্রত্যাশারও উড়ান তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরিচালকের নাম বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে। কাজেই, রিভিউ করতে গিয়ে অনায়াসেই চোখ-কান সজাগ হয়ে গিয়েছিল আপনা থেকেই, যেটা অন্য ছবির ক্ষেত্রে তেমন হয় না। উড়ানে ওঠার সিঁড়িটার ওপর দিকেই দৃষ্টি ছিল। ভাবিনি সিঁড়ির কয়েকধাপ উঠেই আবার নিচের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাতে পড়ে গিয়ে হোঁচট না খাই।

Updated By: Jul 10, 2013, 08:19 PM IST

শর্মিলা মাইতি
ছবির নাম- লুটেরা
রেটিং- ***
আগের ছবি উড়ান উড়ে গিয়েছিল কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। দর্শকের, বিশেষত বাঙালি দর্শকের প্রত্যাশারও উড়ান তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরিচালকের নাম বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে। কাজেই, রিভিউ করতে গিয়ে অনায়াসেই চোখ-কান সজাগ হয়ে গিয়েছিল আপনা থেকেই, যেটা অন্য ছবির ক্ষেত্রে তেমন হয় না। উড়ানে ওঠার সিঁড়িটার ওপর দিকেই দৃষ্টি ছিল। ভাবিনি সিঁড়ির কয়েকধাপ উঠেই আবার নিচের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাতে পড়ে গিয়ে হোঁচট না খাই। পটভূমি স্বাধীনতা-উত্তর বিভক্ত বঙ্গদেশ। জমিদারীপ্রথা নিরসনের আইন করছেন সরকার। পনের একরের অতিরিক্ত জমি থাকলে তার দখল নেবে সরকার। ভাগ-বাঁটোয়ারা হবে কৃষিজীবীদের মধ্যে। অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। জলসাঘর-এর ছবি বিশ্বাস মনে আসে। এ ছবির সময়কাল তা থেকে খানিক এগিয়েই ধরা যেতে পারে। জমিদার রায়চৌধুরী, যে ভূমিকায় বরুণ চন্দ প্রায় চোখের পলক না পড়ার মতো অভিনয় করে গেলেন, তখনও দোর্দণ্ডপ্রতাপ না হলেও প্রতাপশালী। তাঁর প্রাণভ্রমর একমাত্র কন্যা পাখি। সোনাক্ষি সিংহ। প্রোমো দেখে এটুকু সবাই জেনে গিয়েছেন। আর অপূর্ব একটি সুরমূর্ছনা, যা আপনার অন্তরকে একবার হলমুখো করবেই।

পরিচালক বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে এই সময়টা নিয়ে, প্রেম রক্ত বিশ্বাসঘাতকতা মিশিয়ে একটা কাহিনি লিখলেন বটে, তবে... থাক, মন্তব্যগুলো বরং কার্যকারণ সম্পর্ক রেখে করাই সমীচীন। খন্যান রাজবাড়ির সেট, পৌরাণিক যাত্রাপালা দিয়ে শুরুর দৃশ্য সব মিলিয়ে একটা ইন্সট্যান্ট বাঙালি আবহ তৈরি হয়ে গিয়েও ধাক্কা খেল এক জায়গায়। বাঙালি জমিদার তাঁর বাঙালি নায়েবের সঙ্গে কথা বলছেন হিন্দিতে। অথচ উচ্চস্বরে যাত্রাপালা চলছে বাংলায়! এমন ভাষা-ভেদ কেন? প্রথমেই ভ্রুকুঞ্চন কিছুতেই রোখা গেল না, তবে সিনেমায় ঢুকে যেতে সময় লাগল না। সম্ভ্রান্ত সুন্দরী জমিদারকন্যার হাস্যময়ী, আদুরে মুখ। নিখুঁত মেক-আপের যত্নে লাবণ্য চুঁইয়ে পড়ছে। আয়তনেত্র, ঈগলচঞ্চুসদৃশ নাক, নরম ঠোঁট। সোনাক্ষির চলন বলন বাঙালিয়ানা স্পষ্ট হয়ে উঠল। তবু উঠল না। দোষটা সৌন্দর্যের নয়, অভিনয়ের। হাসি হোক বা কান্না, কষ্ট কিংবা বিরক্তি, ঔদাসীন্য ও বিরহ, পূর্বরাগ বা প্রেমবৈচিত্র কোনও পর্বই স্পষ্ট হল না।
এতটা লিখে মনে হচ্ছে, ফেসবুক থেকে ওয়েবসাইট, টিভিচ্যানেল সর্বত্র এত প্রশংসা, সেখানে এহেন নিন্দুকপনা সাজে কি না। জমিদারের জমি জরিপের কাজে আসেন ছদ্মবেশী রণবীর সিংহ। ছদ্মবেশী ছাড়া অন্য প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে ইচ্ছে করছে না, কারণ লুটেরা বললেই ছবির অর্ধেক জীবন চলে যাবে। দীর্ঘশ্বাস পড়ে এখানেও। শার্ট-ট্রাউজার-জুতো সমন্বয়ে কস্টিউমের নিরিখে ইনি এমন ধোপদুরস্ত যে, বিশ্বাস করতেই ইচ্ছে করে না এঁর পকেটে মোবাইল নেই! এমন খাদস্বরে কথা বলেন যে হলের অ্যাকুস্টিকস অমরগোপাল বসু মহাশয়ের শ্রমপ্রসূত হলেও কান পেতে শুনতে হবে। প্রেমদৃশ্যেও কোথাও সোনাক্ষি-রণবীরের কেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি খুঁজে পাওয়া যায় না। এটুকু বোঝা যায় নীরব প্রেমপর্বে এঁরা ঠিক তালিমপ্রাপ্ত নন, যৌবনের উচ্ছ্বাসে ভেসে-যাওয়া আর সব ছবিগুলোয় এঁরা যেমন প্রবল আকর্ষক। এখানে এঁরা তেমনি বেমানান। তবে চেষ্টার ত্রুটি নেই।

সবটাই নিরাশ করার মতো নয় অবশ্য, কয়েক ঝলক অভিনয় এঁর চাহনিতেও পাওয়া গিয়েছে। মোক্ষম সময়ে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, ইন্টারভ্যালের খানিক আগেও। ছবির গায়ে কাঁটা দেওয়া অংশ এই সময়টাই। অন্দরমহলে বিয়ের সাজে সাজছেন জমিদারকন্যা। বাইরে মেয়ের বিয়ের আগে স্বর্ণবিগ্রহ পূজা করতে গিয়ে স্বয়ং জমিদারমশাই আবিষ্কার করেন, গঙ্গাজলের ধারায় স্নান করাতেই সোনার বদলে মাটির মূর্তি গলে গলে পড়ছে। বিগ্রহর তলায় গভীর অনন্ত সুড়ঙ্গ! বরুণ চন্দের শূন্য চাহনি। উধাও দুই যুবক!
এত উত্তুঙ্গ প্রত্যাশা দিয়ে অর্ধাংশ শেষ হয় যে, উত্তেজনায় পপকর্ন কিনতে ওঠার কথাও ভুলে যেতে হয়। তবুও দ্বিতীয়ার্ধ যে এমন ধাপে ধাপে খাদে নেমে যাবে ভাবা যায় না। দ্বিতীয়ার্ধে শুরু পাখির জীবনযুদ্ধ। যেটা সোনাক্ষি সিংহ-র কাছেও পরীক্ষা। পরের পর একশ কোটির ছবির নায়িকা অভিনয়েও দক্ষ কি না। যক্ষ্মারোগশীর্ণা সুন্দরী তখন নিজের অতীতের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছে। নাঃ, পরতে পরতে খামতিই চোখে পড়ে। এ বঙ্গদেশেই এমন নায়িকা দুর্লভ নয়, যাঁরা এমন সুযোগ পেলে উজাড় করে ঢেলে দিতেন। করুণাই হল।

ও হেনরির গল্প থেকে প্রেরণা নিয়েছেন পরিচালক। ট্রিবিউট-এর প্রতিশব্দ টোকাটুকি বলেন চোখে আঙুল দাদারা। এটাকে ঠিক কী বলা যায় জানি না, অন্তত প্রেরণা শব্দটা বড়ই মৃদু। এ ছবির কলমের ক্রেডিটও এই বিদেশি লেখকের প্রাপ্য, যেটা এখানে নির্মমভাবে অস্বীকৃত থেকে গেল। দ্য লাস্ট লিফ থেকে প্রায় প্রতিটি অক্ষরই (পটভূমি ও চরিত্র বাদে) তুলে আনা হয়েছে এই ছবিতে। সেই মৃত্যুমুখী দৃষ্টি, সেই রং-করা পাতা, সেই সুতো দিয়ে বাঁধা, সেই তুষারঝড়ে চিত্রশিল্পীর পড়ে যাওয়া... শুধু তফাত এটাই, বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না। গল্পের চিত্রশিল্পী মরে গেলেও এ ছবির নায়ক রণবীর সিং ছবির বাণিজ্য আরও খানিকটা বজায় রাখতে বার বার লাইফলাইন পেয়ে যান। শরীরের বিপজ্জনক জায়গায় গুলি লাগলেও অবিনশ্বর হয়ে থাকেন, পায়ে গুলি লাগলেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন কয়েকদিনে। তুষার ঝড়ে উঁচু গাছ থেকে পড়ে গেলেও আবার বেঁচে-বেঁচে ওঠেন। গল্প টেনে-টেনে বেড়ে চলে, দর্শকও অপেক্ষা করতে থাকেন কখনও তাঁর মৃত্যু হবে!
ছবি জুড়ে একটা বড় প্রাপ্তি ক্যামেরার কাজ। শুধুই দেখে যেতে হয়। যে-গানটা ট্রেলারে শোনা যাচ্ছে, সেটা বাদে আর কোনও গানের কথা মনেও দাগই কাটবে না। দিব্যা দত্ত কেনই বা এমন অগভীর এক চরিত্রে অতিথিশিল্পীর তকমা নিয়ে অভিনয় করলেন কে জানে! সবশেষে আবার একটা বড়সড় প্রত্যাশা নিয়েই অপেক্ষা করা যাক বিক্রমাদিত্যের পরের ছবিটার জন্য। কারণ, এই প্রত্যাশাটা মাটি থেকে নয়, খাদ থেকে শুরু হচ্ছে। লুটেরা অনেকখানিই লুঠ করে নিল যে!

.