তাঁর গানে চিরকাল একঝাঁক পাখিদের মতো কিছু রোদ্দুর

তাঁর গানে গভীর ভাস্কর্যের পেলব অলৌকিকতা।

Updated By: May 1, 2021, 03:04 PM IST
তাঁর গানে চিরকাল একঝাঁক পাখিদের মতো কিছু রোদ্দুর

সৌমিত্র সেন

মান্না দে আমাদের লঘুসঙ্গীত জগতের 'গুরুজন'। দ্য  মায়েস্ত্রো। তিনি গান-জগতের সেই জানলা যার এপারে লঘুসঙ্গীতের বিচিত্র সুর-বাহার আর যার ওপারে উচ্চাঙ্গগানের অপার মাধুরী। 
যে-মাধুরী শ্রোতার অজান্তেই তাঁর লঘু-গানের ভিতরে ভোরের শিশিরের মতো চুঁইয়ে নেমে জমে থাকে এবং ক্রমান্বয়ে এমন এক নিবিড় রসসঞ্চার করে চলে যে, তার কোনও আদি-অন্ত মেলে না! অথচ শিল্পী স্বয়ং এত-এত-এত সচেতন এবং ব্য়ালান্সড্ যে, নিজের তূণের সেরা অস্ত্র প্রায় ব্যবহারই করেন না, অথবা করেন খুব-খুউব পরিমিত মাত্রায়; এমন-মাত্রায় যে, তাতে গানের ভিতরে নতুন-গানের লীলা শুরু হয়ে যায় প্রায়শই। 

এটা হয়, কারণ ১৯১৯-এর জাতক মান্না দে (manna dey) একেবারে  প্রথম দিন থেকেই গানের প্রতি এমন আধুনিক স্মার্ট সাবলীল এক অ্যাপ্রোচ নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সেই সময়ে, যা তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে প্রায় দেখাই যেত না! যদিও প্রথম জীবনের সুর-সহকারী-পর্ব কাটিয়ে যখন পুরোপুরি গাইতে এলেন তিনি, তখন তাঁর চেয়ে বয়সে ছোটরা বেশ প্রতিষ্ঠা অর্জন করে নিয়েছেন। তবে অনেকটা পরে শুরু করেও তিনি তাঁর গানকে ক্রমশ এমন এক উচ্চতায় ও অমরত্বে নিয়ে চলে যেতে পেরেছিলেন যে, শ্রোতারা তাঁর জন্য আলাদা একটা বর্গ তৈরি করে ফেলতে বাধ্য  হয়েছিলেন। 

মান্নার গানে ভারতের (India) মিশ্র সঙ্গীত-সংস্কৃতির যে-বিচিত্র রৌদ্রপাত, তা বাস্তবিকই বিরল। উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল, কর্ণাটকী, গজল, কাওয়ালি, মরাঠি অভং, পঞ্জাবি গরবা, গাঙ্গেয়  কীর্তন ও লোকসুর এবং পাশ্চাত্যের ব্লুজ-- কীসের ফিনকি নেই তাঁর সৃষ্টিতে? বহুবর্ণ কাঁথার মতো বিচিত্র জটিল রঙিন, কিন্তু কোথাও সেলাইয়ের দাগ নেই। প্রতিভার অমিত-প্রভাবে সমস্ত সুর-সংস্কৃতির নিভৃতনীল নির্যাসটুকু প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে গানকে তিনি উত্তুঙ্গ ভাস্কর্যের পেলব অলৌকিকতায় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।

কেমন? 

একটা মাত্র গানের কথা উল্লেখ করা যাক। 'কত-না নদীর জন্ম হয়'! এই গান শুনলেই মনে হয়, এ গান বাংলার জলমাটিবাতাসেই অনুস্যূত ছিল, অজ্ঞাত; অনেকটা সেই 'অ্যানোনিমাস' রচনার মতো-- বহুকাল ধরে চলে আসছে, কোথা থেকে কী ভাবে কেউ জানে না--মান্না শুধু নিজের কণ্ঠটি সেই সুরে ও বাণীতে স্রেফ মালা করে পরিয়ে দিয়েছেন এবং গানটি যেন অপরিচয়ের আড়াল ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ক্রমে খেয়াল হয়, এ-গান তৈরি করা এবং তা হাল আমলেই, তখনকার গীতিকার-সুরকার বসেই এটা বেঁধেছেন, কিন্তু মান্না গেয়ে সেটার কালপরিচয় ঘুচিয়ে, বাংলা লোকসঙ্গীতের (folk music) অপরিমেয় ঐতিহ্যের সঙ্গে লহমায় সেটিকে জুড়ে দিয়েছেন; কোনও সেলাইয়ের দাগ ছাড়াই!

আরও পড়ুন: গল্পস্বল্প: মহানায়কের মৃত্যুর ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে...

মান্নার গানে বৈচিত্র্যের কথা নতুন করে উল্লেখের কিছু নেই। বলতে-বলত বিষয়টা এতদিনে বড়ই সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। ওঁর হিন্দিগানের বিপুল সমৃদ্ধ ভাণ্ডারের কথা যদি আলোচনায় না-ও টানি, শুধু বাংলাছবির গানেই ওঁর সৃষ্টির মাত্রাভেদ দেখলে চমকে উঠতে হয়। ভেবে স্তম্ভিত হতে হয়, কী ভাবে একই মানুষ 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী' আবার 'চিরদিনের' গান করেন! 'ডাকহরকরা' আবার 'সন্ন্যাসীরাজা'র গান করেন!' আর নন-ফিল্ম ডিস্কে? সেখানে তো মণিমুক্তোর ছড়াছড়ি! কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব? সদাশ্রুত বহুচর্চিত গানগুলি যদি ছেড়েও রাখি তাহলেও যেগুলি পড়ে থাকে, যেমন-- 'আমার একদিনে শুধু তুমি', 'তুমি অনেক যত্ন করে', 'আমি ফুল না হয়ে', 'একদিন ভালবাসা মৃত্যু যে তারপর', 'আমায় আকাশ বলল'-- সবই যেন গানের আত্মার অতলান্ত ছুঁয়ে আসা এক-একটা আকুল 'ইমেজ' ও অনন্য 'অ্যাপিয়ারেন্স'।

আর অতি-চেনা গানের কথায় যদি আসা যায়? সেখানেও গানের সঙ্গে পরিচয় যেন শেষ হয় না। যেমন ধরুন, আপাতভাবে হালকা মেজাজের গান-- 'ও কেন এত সুন্দরী হল'। এই গানে লঘু অ্যাপ্রোচ, লঘু চাল। কিন্তু তারই মধ্যে গানকে অতিক্রম করে যাওয়া সাঙ্গীতিকবোধ উঁকি দেয়। ওখানে একটা জায়গায় আছে-- 'আমি তো মানুষ'। এই 'আমি তো মানুষ' অংশটি বক্তা (এখানে গায়ক) বিস্ময়চিহ্ন এঁকে দিয়ে বলতে চাইছেন। খেয়াল করে দেখবেন, এখানে সুরের নোটেশন যা-ই থাক, মান্না কী অবলীলায় গানের মধ্যে এক্সক্ল্যামাটরি সাইন বসিয়ে দেন! গানটা জীবন্ত হয়ে ওঠে। 

এসব হয়েছে কেননা, ওই যে-কথাটা আগেই বলা হয়েছে, গানের প্রতি মান্নার আধুনিক অ্য়াপ্রোচ। ভাবা যায়, ষাটের দশকের প্রতিষ্ঠিত কোনও গায়ক কোনও তরুণ গীতিকারকে বলছেন, চাঁদ-তারা-ফুল-পাখি দিয়ে গান না লিখে, যেন আধুনিক মনন দিয়ে লেখা হয়! এক চিঠিতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এমনই উপদেশ দিয়েছিলেন মান্না। 

মান্না তাঁর গানে শব্দের উচ্চারণকে একটা ভিন্ন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। গানে স্বরক্ষেপণকেও একটা আলাদা মাত্রায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। এটা নিশ্চয়ই প্রথম থেকেই হয়নি, তিনি ক্রমে নিজেকে বদলে-বদলে নিয়েছেন। এই করতে-করতে সত্তর দশকে মান্না যে-সব গান গাইলেন তা আজও শুনলে মনে হয় তিনি ঠিক এখনকার ডিকশন এখনকার বাচন এখনকার ফ্লেভার দিয়েই গাইছেন! কী ভাবে ঘটে এই ম্যাজিক! প্রতিভা? শুধুই প্রতিভা বোধ হয় নয়, আরও কিছু, আরও অন্য কোনও অমেয় রহস্য এখানে নিশ্চয়ই শুয়ে আছে। শ্রোতাকে বরাবর সেই রহস্যভেদ করে-করে তাঁর গানের ভিতরে ঢুকে পড়তে হবে। 

'পৃথিবী তাকিয়ে দেখো', 'তুমি আর আমি আর আমাদের সন্তান' বা 'আজ আবার সেই পথেই দেখা হয়ে গেল' শুনলে তো মনে হওয়াই স্বাভাবিকই যে, তা ঠিক আজকের সময়ের কথা আজকের মতো করেই বলছে। যেখানে কোনও কালোয়াতি নেই, হরকত নেই, তান-কর্তব নেই, সরগম নেই-- শুধু আধুনিক মানুষের মর্মের বেদনার অনুভূতির বিচ্ছুরণ, একটা শান্ত আলো, একটা হিম স্পর্শ, একটা উষ্ণ আবেগ নিরুচ্চার ভাবে রয়ে গিয়েছে। 'খুব জানতে ইচ্ছে করে'-- অতি-অতি সাধারণ বাচনভঙ্গির এই গানটিতে কী আছে? অথচ শুনলে মর্মরিত মর্মের ভিতরে ঠিকরে পড়ে না কি দ্বাদশীর চাঁদ?

মান্নার এই গানগুলিতে কি তবে গীতিকার-সুরকার কারও অবদানই স্বয়ং গায়কের চেয়ে বেশি নয়? তাই কি এ-লেখায়  গানের কথা বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট গানের গীতিকার বা সুরকারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলছে এই মান্না-স্মরণ? একেবারেই তা নয়। মান্না নিজে গানের বাণী ও সুর নিয়ে সাঙ্ঘাতিক রকমের খুঁতখুঁতে ছিলেন। এবং তা মনোমতো না হলে কিছুতেই গান রেকর্ড করতে চাইতেন না। সিনেমার গানের ক্ষেত্রে এটা করা তত সম্ভব হত না, কিন্তু তিনি তাঁর ডিস্ক গানের জন্য এভাবেই স্ক্রিনিং চালাতেন। এবং তিনি গীতিকার-সুরকারকে যে দারুণ গুরুত্ব দিতেন, তার প্রমাণও আছে। বাংলা গান ও তার ইতিহাস নিয়ে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করে আসছেন, তাঁরাই বলছেন, এটা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য যে, মান্না দে-ই প্রথম শিল্পী যিনি তাঁর স্টেজ শোগুলিতে কোনও গান গাইবার আগে সেই গানের  গীতিকার-সুরকারের কথা নিয়ম করে উল্লেখ করতেন। এটা মান্না দে'র আগে ঠিক এভাবে কেউ করেননি। 

আসলে সব দিক থেকেই একটা আধুনিকতা (modern), একটা ভিন্নতা, একটা অপ্রচল কিন্তু কার্যকরী ধাঁচে তিনি তাঁর ৭০ বছরের সঙ্গীতজীবন যাপন করে গিয়েছেন। সেখানে চিরকালই ঠিকরে পড়েছে একঝাঁক পাখিদের মতো কিছু রোদ্দুর! যা বাধা ভেঙে দূরত্বের শার্সি-সমুদ্দুর আজও আমাদের শ্রবণমনসৈকতে ছড়িয়ে দেয় নিমগ্ন অনুভূতির সফেন আশ্লেষ।  

আরও পড়ুন: শিরদাঁড়া সোজা রেখে বেলাশেষেও প্রতিবাদী সৌমিত্র