গল্পস্বল্প: সে দিন মিটু থাকলে বায়োস্কোপে প্রথম যৌন হেনস্থার শিকার হয়তো কাননদেবীই

হাওড়ার এদো গলির কানন বালা থেকে ভারতের  কানন দেবী হয়ে ওঠার লড়াইয়ের মাঝখানে প্রেম, প্রলোভন, প্রবঞ্চনার লম্বা অধ্যায়

Updated By: Jul 17, 2020, 08:05 PM IST
গল্পস্বল্প: সে দিন মিটু থাকলে বায়োস্কোপে প্রথম যৌন হেনস্থার শিকার হয়তো কাননদেবীই
ফাইল চিত্র

সুমন মহাপাত্র

সম্প্রতি খ্যাতনামা এক টলিউড অভিনেত্রী লিখেছেন, এক প্রযোজক তাঁর পোশাকের মাপ নিজের হাতে নেবেন। টাইম মেশিনে চেপে বছর নব্বই পিছিয়ে গেলেও ঘটনার প্লট-দৃশ্য একই, বদল শুধু চরিত্রে। "জোর বরাত" সিনেমার শুটিং চলছে, রিহার্স্যালে হয়নি তবু  হিরো হঠাৎ জাপটে ধরে  চুমু খেলেন নায়িকাকে। সেদিন পরিচালকের সায় ছিল, তাই প্রতিবাদ হয়নি। তবু ভিতরটা খুব কেঁদেছিল নায়িকার। নিজেকে মনে হয়েছিল পরিচালকের হাতের পুতুল!

সেই অভিনেত্রী হলেন বায়োস্কোপে সকলের চোখের মণি, গায়িকা নায়িকা কানন দেবী। তবে হাওড়ার এদো গলির কানন বালা থেকে ভারতের  কানন দেবী হয়ে ওঠার লড়াইয়ের মাঝখানে প্রেম, প্রলোভন, প্রবঞ্চনার লম্বা অধ্যায়।

জুয়াড়ি বাবা একরাশ দেনা রেখে চোখ বোজেন। ভিটেমাটি খুইয়ে কাননের স্থান হলো আত্মীয়র বাড়িতে। মা ওই বাড়ির ঝি, চুন থেকে পান খসলেই রে রে করে তেড়ে আসে আত্মীয়রা। বেশি দিন টেকেনি সে আস্তানা। আধপেটা খেয়ে শেষ ঠিকানা এক ভাড়াবাড়ি।

আরও পড়ুন- গল্পস্বল্প: প্রেম, দাম্পত্য, বিচ্ছেদ- তসলিমাকে নিজের হাতে গড়েছিলেন কবি রুদ্র

নয়-দশ বছরের কানন, রূপে লক্ষ্মী কন্ঠে সরস্বতী। প্রতিবেশী কাকাবাবু এসে বললেন, "তোমার চেহারা ভাল, একবার যদি চান্স পাও ব্যাস আর দেখতে হবে না।" পেট চালানোর দায়েই স্থান হলো ম্য়াডান থিয়েটারে। জ্যোতিষ বন্দোপাধ্যায়ের "জয়দেব" ছবির রাধা হিসেবে বায়োস্কোপের পথ চলা শুরু। দক্ষিণা মিলেছিল ৫ টাকা। বাকি ২০ টাকা খেয়েছিল দালালে। ধীরে ধীরে কাননের অভিনয় নির্বাক "শঙ্করাচার্যর" গণ্ডি পেরিয়ে কথা বলল সেই "জোর বরাত" সিনেমায়।

এরপর রাধা ফিল্মসের ব্যানারে "শ্রী গৌরাঙ্গ" ছবি, বিষ্ণুপ্রিয়া চরিত্রে নিজের গানের গলায় মাতালেন সকলকে। রাতারাতি সিনেমা পাড়ায় দর বেড়ে গেল কাননের। কিন্তু বারবারই হেন তেন প্রকারেণ হিরোরা লোলুপ দৃষ্টিতে এগিয়ে আসতো তাঁর দিকে। বলতো জড়িয়ে ধরা কিংবা চুমু জলভাত করতে হবে।

একদিন এক নায়ক সাজঘরে ঢুকলেন, "ন্যাচরাল অ্যাক্টিং" শেখাবেন। ডান হাত নিয়ে বুকে রাখলেন, চোখ-মুখ গদগদ, হাতের বাঁধন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। কোনও মতে পালিয়ে বেঁচেছিলেন কানন। এক পরিচালকও সুযোগ নিতে ছাড়েননি। এক কোনে নিয়ে গিয়ে একগাদা টাকা দিয়ে বলেছিলেন রেস দেখতে যাবে?

তবে তাঁর লাঞ্ছিত জীবনের ইতি টেনেছিল তাঁরই ছবি  "মানময়ী গার্লস স্কুল।" উত্তরা, রূপবাণী ও পূর্ণ মিলিয়ে থিয়েটারে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিল এই ছবি। এরপর "দরবেশ" দিয়ে রাধা ফিল্মসের পাট ঘুচল। শুরু হল নিউ থিয়েটার্সের হাতিমার্কা ব্যানারে নানা রঙা অধ্যায়। এনটিতে প্রথম ভারতজোড়া মর্যাদা এনেছিল গায়িকা নায়িকা কাননের "বিদ্যাপতি।" দেবকী বসু, মি: বড়ুয়া -সহ নামজাদা বহু পরিচালক গল্প বেঁধেছেন কাননকে নায়িকা করে। মুন্সীর সারেংগী, রাইচাঁদ বড়াল কিংবা পঙ্কজ মল্লিকের সুরে কাননের গলা, বেশ গানের জোরেই সব ছবি হিট।

আরও পড়ুন- গল্পস্বল্প: ফ্যাতাড়ুরা যে কখন বিস্ফোরণ ঘটাবে সরকারও টের পাবে না!

এনটিতেই কানন দেবীর একের পর এক হিট- মা, মুক্তি, জওয়ানি কি রাত, খুনি কৌন, বনফুল, আশা আরও কত কী! বিপরীতে কখনও পাহাড়ী সান্যাল, কখনও জহর গাঙ্গুলি কিংবা অন্য কেউ। পরবর্তীতে নিজেই প্রোডাকশান হাউস খোলেন কানন, নাম দেন "শ্রীমতী পিকচার্স।" একবার বড়ুয়া সাহেবের দেবদাসে পার্বতীর রোল পেয়েও করা হয়নি। তাই হয়তো শ্রীমতী পিকচার্সের বেশিরভাগ কাজেই শরৎ রচনাবলী।

তবে কানন দেবী একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমি গায়িকা হলে বেশি ভাল হতো। হয়তো রুপোলি পর্দার অন্ধকারগুলো কোথাও আঘাত করেছিল কাননকে। আজকাল নায়িকারা যৌন হেনস্থার বিরোধিতায় প্রকাশ্যে প্রযোজক-পরিচালকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন আমিও শিকার, "মিটু।" সেকালে কি আর মেয়ের  জোর ছিল!

কানন দেবীর অভিনয় আজ বাঙালির রোজনামচায় না থাকলেও কান পাতলে তাঁর গলায় শুনতে মেলে "আমি বনফুল গো" কিংবা "আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে!"   সত্যিই জীবনের চড়াই উতরাই বড্ড রঙীন পদ্মশ্রী কাননের। আজ তাঁর মহাপ্রয়াণের দিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ।

আরও পড়ুন- গল্পস্বল্প: “বিধান তুমি থাকতে আমার শ্যামা ভুল চিকিৎসায় মারা গেল”

পিতৃ পরিচয় নিয়ে অসঙ্গতি ছিল। তাতে কাননের কোনও ক্ষোভ ছিল না। তাই তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন, "আমি মানুষ এটুকু পরিচয়ই যথেষ্ট", এবার বলুন তাঁর জীবন আজকের মিটুকে ছাপিয়ে যায় কিনা! নাকি দেশের রুপোলি বায়োস্কোপে যৌন হেনস্থার প্রথম শিকার "তারকা" কানন?