Climate Change: নিম্নচাপের খবরে খুশি হয়ে খিচুড়ির প্ল্যান না করে এবার থেকে একটু অন্য 'প্ল্যান' করুন!

নিম্নচাপের নিভৃত নির্জনে ছুটির আমেজপূর্ণ একটি 'রেনি ডে' প্রাপ্তিতেই খুশি থাকব?

Updated By: Sep 28, 2021, 05:30 PM IST
Climate Change: নিম্নচাপের খবরে খুশি হয়ে খিচুড়ির প্ল্যান না করে এবার থেকে একটু অন্য 'প্ল্যান' করুন!

সৌমিত্র সেন

ভরা আশ্বিনের ক্যালেন্ডারে ভরা বর্ষার ছায়া। শক্তিশালী ঘূর্ণাবর্ত, তুলনায় কম শক্তিশালী ঝড় বা নিম্নচাপের এই যে এক অন্ধ চক্র প্রায় সারা বছর জুড়ে ইদানীং গড়িয়ে চলে, তার একটা নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়েই। দেশে দেশে যুগে যুগে পরিবেশের সঙ্গে মানুষের আন্তঃসম্পর্কের একটা নিবিড় ইতিহাস আছে। গত কয়েকদিন এবং আগামী কয়েকদিনের ঘনঘোর অকাল-বর্ষার যে ভ্রুকূটি নিয়ে আমরা নাজেহাল, সেই প্রেক্ষিতেই এই ভাবনাটা আরও বেশি করে উঠে আসছে।

যদিও আবহাওয়ার এই পরিবর্তন প্রায় বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তরও থাকছে না আমাদের। সহনশীলতার মাত্রা বাড়িয়ে দৈনন্দিন বিরক্তি বা ক্ষোভকে খানিক প্রশমিত করা ছাড়া দ্বিতীয় সান্ত্বনার অবসরই-বা কই?

অথচ, এমনটা ঠিক কেন হচ্ছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিবেশবিদেরা চিন্তা করেছেন। আমাদের সাবধানও করেছেন। বিশ্বের তাবড় তাবড় রাষ্ট্রগুলি ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে গুরুগম্ভীর বৈঠকে বসেছে। কিছু সমাধানসূত্র বেরিয়ে এসেছে। তার কিছু তারা মেনেছে। কিছু মানতে পারেনি। কিছু মানতে চায়নি বলেই মানেনি। এবং সব মিলিয়ে পরিবেশ-প্রকৃতিকে রক্ষা করে আবহাওয়ার নেতিবাচক বদলটা রুখে দেওয়া নিয়ে একটা ধোঁয়াশার পরিবেশই তৈরি হয়ে থেকেছে। 

কিন্তু গলদটা কোথায়? সেটা আসলে অনেক অনেক গভীরে। ইতিহাসের বেশ কিছুটা ধূসর যুগ থেকে সেই অসচতেনতা ও অব্যবস্থার ঢেউটা উঠেছে। অথচ, আমরা দেখেও দেখিনি।

আরও পড়ুন: Weather Update: নিম্নচাপের ভ্রুকুটি! কয়েক ঘণ্টায় দক্ষিণের এই জেলাগুলোতে ধেয়ে আসছে বৃষ্টি

প্রধান গলদটাই হল উন্নয়নের শিকড়ে, নগরায়ণের মূলে। ইউরোপীয় উন্নয়ন তথা নগরায়ণের ভিত্তিটাই বুর্জোয়া এবং তার দর্শনও কনজিউমারিজমের কোল ঘেঁষে। নদীর ধারে, সমুদ্রের ধারে, পাহাড়ের কোলে, বনের ধারে বসবাস করার মানসিকতায় যে বানিয়ে তোলা অভিজাত্যের বীজ ছড়িয়ে থেকেছে এই নতুন গড়ে-ওঠা নির্মাণের অন্তরে তা আসলে নিয়মিত প্রকৃতিকে চোখ টিপে বিলাসিতার 'গো গ্রিন' অ্যাটিটিউডের স্খলিত চর্চা। হালে পরিবেশবিধিকে স্বীকার করে দূষণরোধের সঙ্কল্পকে মান্যতা দিয়ে যে ভাবে বিভিন্ন নির্মাণ তৈরি হয়ে ওঠার কথা আমরা শুনি, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটা পবিত্র 'ক্যামোফ্লেজ'। অর্থাৎ, আপাতদৃষ্টিতে পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও, ভেতরে ভেতরে সেখানে প্রভূত খামতি। সতেরো শতকের মুম্বই বা নিউ ইয়র্ক, উনিশ শতকের সিঙ্গাপুর বা হংকং শহর গড়ে ওঠার ভিতরে এই অন্তঃসারশূন্যতাটা ক্রমশ প্রকট হতে থাকে। বিশ-একুশ নিয়ে তো যত কম বলা যায় ততই ভাল।

নিজের এখনও পর্যন্ত একমাত্র নন-ফিকশন গ্রন্থ 'দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট: ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য আনথিঙ্কেবল' বইতে ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ এ বিষয়টিকে খুব মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন এবং আমাদের সজাগ করেছেন। তিনি ওই 'ডিরেঞ্জমেন্ট' শব্দটি ব্যবহার করেই নগরায়ণের বা উন্নয়নের এই বিভ্রান্তি বা বিশৃঙ্খলার দিকে ইঙ্গিত করেন। সুনামির পরেই সরেজমিনে সুনামি-ভয়াবহতা দেখতে ও তা নিয়ে লিখতে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছিলেন অমিতাভ। সেখানেই তিনি নগরায়ণের ওই বিভ্রান্তি দেখে চমকে ওঠেন। দেখেন দ্বীপের মূলবাসী যাঁরা তাঁরা স্থানে স্থানে প্রায় অক্ষত থেকে গিয়েছেন; যত ধ্বংস নেমে এসেছে যেন 'পশ' এলাকাগুলিতে। এ সব ক্ষেত্রে লোকবসতির 'প্ল্যান' যেন সুপরিকল্পিতই, এলোমেলো ভাবে তৈরি হয়ে ওঠেনি, অথচ সেখানে পরিকল্পনার 'সোর্সে'র মধ্যেই বিশৃঙ্খলার ভূত!

অথচ, চিরকালই যে ছবিটা এমন ছিল, তা কিন্তু নয়। এই ইউরোপীয় নগর-পরিকল্পনাই একদা যথেষ্ট খাঁটি অর্থে পরিবেশ-প্রকৃতিকে মাথায় রেখেই গড়ে উঠেছিল। ইউরোপীয় প্রাচীন বন্দর-শহরগুলি, যেমন-- লন্ডন, আমস্টারডাম, স্টকহোম, লিসবন, হামবুর্গ সবগুলিই-- সমুদ্রকে যথেষ্ট সমীহ করে তার সৌন্দর্যকে স্বীকার করেই তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব রক্ষা করে গড়ে উঠেছিল। এশীয় বন্দর-শহরগুলির ক্ষেত্রেও এর অন্যথা ছিল না-- কোচি, সুরাট, তমলুক, ঢাকা। ষোড়শ শতকে বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক দখলদারির আবহাওয়া প্রবল হয়ে ওঠার পরেও আবহাওয়া-বন্ধুত্বের এই ভাবনাটা বিরাজ করত। এটা আমূল বদলাতে শুরু করল তার পর থেকেই। আর স্থায়ী বিপর্যয়ের সূচনাও এর পর থেকেই।

কিন্তু আর কবে আমরা সচেতন হব? ইন্টারগভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (Intergovernmental Panel on Climate Change) বা আইপিসিসি (IPCC) ক'দিন আগেই জানিয়ে দিয়েছে, লাগামছাড়া দূষণ এবং তার জেরে ঘটা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-য়ের জন্য এই শতকের শেষের দিকে ১২টি শহর সমুদ্রজলে প্লাবিত হবে! এর মধ্যে রয়েছে মুম্বই চেন্নাই, কোচির মতো ভারতীয় শহরও। এমনকি কলকাতার খিদিরপুর অঞ্চলও নাকি প্রায় আধফুট জলের নীচে চলে যেতে পারে!

না, আর কি নিম্নচাপের নিভৃত নির্জনে ছুটির আমেজপূর্ণ একটা 'রেনি ডে'র প্রাপ্তিতেই খুশি থাকবে আমাদের মন? নাকি, শহরের স্কাইলাইনে বা গ্রামের দিগন্তে ঘন মেঘছায়া দেখে আমরা মনে মনে সঙ্কল্প নেব যে-- আর নয়, নিজেদের বদলে নিয়ে এবার আবহাওয়ার বদলটাকে রুখে দিতে হবে?

(Zee 24 Ghanta App : দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির লেটেস্ট খবর পড়তে ডাউনলোড করুন Zee 24 Ghanta App)

আরও পড়ুন: Weather Update: দক্ষিণবঙ্গে ঘূর্ণাবর্তের চোখরাঙানি, কলকাতা, হাওড়া-সহ বহু জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস