কাছে থেকে দূর রচনার এক কমপ্লেক্স ক্রমশ ছেয়ে ফেলছে নাগরিক জীবন

রক্তক্ষরণ হলে তা হয়েই চলে, কেউ জানতে পারে না। আসলে ব্লটিংটা তো হারিয়ে ফেলেছি আমরা। আর কমপ্লেক্সটাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে ফেলেছি।

Updated By: Sep 18, 2020, 06:53 PM IST
কাছে থেকে দূর রচনার এক কমপ্লেক্স ক্রমশ ছেয়ে ফেলছে নাগরিক জীবন

সৌমিত্র সেন

ফ্যাশন ডিজাইনার শর্বরী দত্তের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শহরজীবনের অন্তঃসারশূন্যতার দিকটিই যেন আরও একবার দেখিয়ে দিল। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গিয়েছেন শর্বরী। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোধ হয় আমরা বুঝতে পারব, এ রক্তক্ষরণ শুধু মস্তিষ্কে নয়, হৃদয়েও হয়েছে প্রভূত প্রচুর।

সারা দিন ধরে ছেলে জানেন না, তাঁর মা কোথায়! রাতে বাথরুম থেকে মায়ের দেহ উদ্ধার হয়! আর ছেলে জানাচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের কাজকর্ম নিয়ে যেভাবে ব্যস্ত থাকেন তাতে দিনের পর দিন পরস্পরের সঙ্গে দেখা না হওয়াটাই দস্তুর! অথচ পরে জানা যাবে, সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে মারা যাওয়া মায়ের দেহের খোঁজ ছেলে পাবেন রাতে! এটাই দস্তুর বইকি! একই বাড়িতে ভিন্ন তলায় মায়ের ও ছেলে-বউয়ের সংসার, অথচ তা-ও পরস্পরের ভিতরে কত জটিল দূরত্ব! 

এই অটল দূরত্ব নিশ্চয়ই শুধু শর্বরীর একার সংসারের জিনিস নয়; এ-দূরত্ব বলতে গেলে এখন আমাদের ক্রমজটিল নাগরিকজীবনের 'পার্ট অ্যান্ড পার্সেল'; এ থেকে ক্রমমুক্তির আলোকরুণ পথ কি আছে আদৌ? হয়তো আছে। হয়তো নেই। কিংবা তা হয়তো চিরদ্বান্দ্বিক কোনও অক্ষকোটিতে আছে-নেইয়ের এক নিরালম্ব শূন্যতার মধ্যে দাঁত বের করে হাসছে আমাদের দিকে চেয়ে। সে হাসিকে অনুবাদ করে নেবেন হয়তো অনাগত কোনও মনোবিদ, কোনও সমাজবিদ। কিন্তু তার পর? অথবা তার আগে?

আমাদের ভেবে দেখতে হবে কেন আমরা জীবনযাত্রার জটিল গাঢ়  কানাগলিতে নিয়তই এ ভাবে ঢুকে পড়ছি? ঢুকে পড়ছি, কারণ, ক্রমবিস্ফারিত এই মহাবিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মতোই আমরা পরস্পরের থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছি। ভার্চুয়াল সম্পর্ক আমাদের জন্য দিনের শেষে কোনও নিটোল শান্তির নীড় রচনা করছে না। বরং দৈনন্দিন সংসারের পরিসরে কাছের মানুষটির দিকে নিজের হাতে এক গ্লাস ঠান্ডা জল এগিয়ে দেওয়া বা তাঁকে 'কেমন আছো?' জাতীয় কিছু আপাত-সাধারণ কিন্তু নিভৃত উষ্ণ প্রশ্নই সম্পর্কের শাঁসটিকে বাঁচিয়ে রাখে। 

অথচ আমরা অনুভূতির উত্তাপবিহীন 'ড্রয়িংরুম ম্যানার্স' নিয়েই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে মিশছি। একান্ত নিজস্ব কাজের জগতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকছি। কর্মজীবনের পেশাদারিত্বকে গৃহজীবনের ডেস্কে সদর্পে সাজিয়ে রাখছি। নিজের চারিদিকে এক অলক্ষ্য 'ডু নট ডিস্টার্ব' টাঙিয়ে রেখে দিচ্ছি। আমরা 'সেল্ফ'কে এত গুরুত্ব দিচ্ছি যে, 'আদার্স' বাস্তবিকই আমাদের কাছে চির 'অপর' হয়ে থেকে যাচ্ছে! এবং এক শাশ্বত একাকিত্বের অন্ধ পাঁকের মধ্যে আমরা নিজেদের সগর্বে ডুবিয়ে দিচ্ছি। দোষ একা ছেলে-বউয়ের নয়, দোষ একা মায়েরও নয়। কিন্তু পারস্পরিক দূরত্ব রচনার সযত্ন প্রতিযোগিতাই এই শ্বাসরোধী 'স্পেসে'র জন্ম দিয়ে চলেছে। 

এখানে অন্য একটি বিষয়ও আছে। শর্বরীদেবীর সংসারের এই অসুখ একেবারেই আমাদের কিনু গোয়ালা বা হরিপদ কেরানিরও একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিসম্পর্কের ভিতরেও সমানভাবে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে, ভেবে নিলে কিন্তু একটু ভুল হবে। সেলিব্রিটিদের জগতে এমন অনেক কিছুই অনায়াসে ঘটে যায়, যা আমাদের সাধারণ আটপৌরে জীবনের শিরদাঁড়ার ভিতর দিয়ে চকিতে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয়। সেই উদাহরণ তো কিছু কম নেই। রামমোহনের সঙ্গে তাঁর মায়ের আদর্শগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের গোটা সাংসারিক জীবনটাই তো কেবল মিলন-বিচ্ছেদের কাছে-আসা সরে-থাকার পর্যায়ক্রমিক ওঠা-নামায় মথিত ছিল। সারাজীবনের জন্য মাতৃনিবেদিতপ্রাণ বিদ্যাসাগরও এক সময়ে সংসারের জ্বালা থেকে রেহাই পেতে মা-ভাইয়ের থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। গান্ধীর সঙ্গেও তাঁর সন্তানের বোঝাপড়ায় যথেষ্ট খামতি ছিল। কস্তুরবার সঙ্গে মহাত্মার মাঝে-মাঝেই বিরোধ বাধত, দূরত্ব তৈরি হত। আর স্ত্রীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চির-দূরত্বের ইতিহাস তো বহুচর্চিত। জীবনানন্দেরও সাংসারিক জীবন ছিল ভয়ানক জটিল, শৈত্যনিঠুর, স্তব্ধ, কুয়াশাপ্রবণ। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রথম পর্বের দাম্পত্যজীবনও যথেষ্ট অশান্তিময় ছিল। আরও পরে-পরে যদি তাকাই। উদাহরণ শেষ হওয়ার নয়। শম্ভু মিত্র-তৃপ্তি মিত্রের সংসারে ফাটল ধরেছিল, সত্যজিতের সাংসারিক পরিসরে ঢেউ উঠেছিল আর নিজের সংসার থেকে উত্তমকুমারের দূরে সরে থাকার কাহিনি তো এক সময়ে বাঙালির প্রিয় গসিপে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু কেন? কেন? কেন? 

কারণ সৃষ্টিশীল মানুষের মনের মধ্যে সব সময়েই একটা আত্মসঙ্কট, একটা অনিশ্চয়তার নিগূঢ় টেনশন কাজ করে। নিজেকে নিয়ত বুঝতে গিয়ে, নিজের প্রতিভা ও সৃষ্টিকে বুঝতে গিয়ে এবং বুঝে নিয়ে নিজেকে নতুন করে ভাঙতে ও গড়তে গিয়ে তিনি এমন নিরুপায় ভাবে নিজের মধ্যে ক্রমশ সংশ্লিষ্ট  হয়ে যান যে, তাঁর চারপাশের মানুষ সম্বন্ধে তাঁর মনে আর কোনও বিশেষ অনুভূতি কাজ করে না। তাঁকে তখন অনেকটা স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক ভোঁতা এক অস্তিত্ব বলে মনে হয়। হয়তো বাস্তবিকই তা সত্য নয়, কিন্তু এটা ঘটে যায়। মানুষ নিকটে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়। তখন, যা ছিল আপাত, তাই হয়ে দাঁড়ায় খাঁটি সত্যি। এবং সেই বিন্দু থেকেই ভুল বোঝার শুরুর শুরু।

কিন্তু রবীন্দ্র-জীবনানন্দ-সত্যজিতের চারপাশের সামাজিকতার মোটামুটি যে ধরন-ধাঁচ ছিল, পরে সেটার আমূল বদল ঘটে গিয়েছে। ওঁদের সময়েও শতক-ওয়াড়ি, দশক-ওয়াড়ি ভেদাভেদ ছিল। কিন্তু সে সব বাদ দিয়েও কিংবা বলা ভাল স্বীকার করে নিয়েও আরও নানা ছোট-বড় অদল-বদল আমাদের ব্যতিব্যস্ত করল। তখনও পর্যন্ত পারিবারিক জীবন অনেক সংহত ছিল। ঝগড়া-বিবাদ ছিল কিন্তু 'গল্প হলেও সত্যি'র মতো তা মিটেও যেত। একান্নবর্তী পরিবারের গঠন নিয়ে আধুনিক সমাজবিদেরা যতই ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাবের অভিযোগ তুলুন না কেন, সেই সংসার কিন্তু অনেক ঘাতসহ ছিল। অনেক টেনশন, অনেক রক্তক্ষরণ ব্লটিংয়ের মতো শুষে নিত। তখন পাড়া-সংস্কৃতিও খোলা বারান্দার মতোই অনেক খোলামেলা ছিল। টেরাসের সংকীর্ণতা তাকে গ্রাস করেনি। ফলে একদিকে নিজের ঘরের কোণ অন্য দিকে নিজের পাড়ার রক মানুষকে শ্বাস নেওয়ার জরুরি স্পেসটা দিত। 

এখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনেও আর সেসবের কোনও কিছুরই কোনও অস্তিত্ব নেই। ফলে রক্তক্ষরণ হলে তা হয়েই চলে, কেউ জানতে পারে না। আসলে ব্লটিংটা তো হারিয়ে ফেলেছি আমরা। আর কমপ্লেক্সটাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে ফেলেছি।