Left Front: CPI-এর পোস্টার বয় কানহাইয়া কংগ্রেসে, বিকল্প তৈরিই কি শেষ পথ বামেদের?

২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর থেকে বামপন্থীদের ভোটব্যাঙ্কে ক্রমাগত ধস লক্ষ্য করা গেছে। ২০১১ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্ট (Left Front) মোট ৬২টি আসন দখল করে।

Edited By: অনুষ্টুপ রায় বর্মণ | Updated By: Sep 27, 2021, 07:18 PM IST
Left Front: CPI-এর পোস্টার বয় কানহাইয়া কংগ্রেসে, বিকল্প তৈরিই কি শেষ পথ বামেদের?

অনুষ্টুপ রায় বর্মণ: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২১ সাল বামপন্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বাম এবং কংগ্রেসের সদস্য সংখ্যা শুন্যে এসে ঠেকেছে। যদিও বামেদের প্রার্থী তালিকা দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন তারুণ্যের উপর ভরসা রাখা শুরু করছে বামেরা এবং অবশ্যই তরুণরাও হয়ত আবার ঝুঁকছে বামেদের দিকে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বামেদের তরুণ মুখ হিসেবে যাদেরকেই জাতীয় স্তরে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে তারাই বিভিন্ন সময়ে বামেদের সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছেন। CPI-এর তরুণ নেতা এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বিহারের বেগুসরাইয়ের প্রার্থী কানহাইয়া কুমার ২৮ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসে যোগ দেবেন বলে কথা চলছে। অপর দিকে CPI(M)-এর একদা পোস্টার বয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, যাকে বামেরা রাজ্যসভার সাংসদ পদে মনোনীত করে, তিনিও বর্তমানে তৃণমূলের সাংগঠনিক স্তরে বড় দায়িত্ব পেয়েছেন।

২০১১ সালে বামেদের পতনের পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে বৃদ্ধতন্ত্রের বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করেন বাম দলগুলিতে তরুণ নেতৃত্বের অভাব এর ফলেই তাদের ভোটব্যাঙ্কে লক্ষণীয় প্রভাব পড়ছে। ২০২১-এর নির্বাচনে বামেদের প্রার্থী তালিকায় তারুণ্যের জোয়ার এবং প্রচারে "টুম্পা সোনার" মত গানের অভিনবত্ব দেখা গেলেও ১৭৭টি আসনের মধ্যে ১৫৮টি আসনেই জামানত জব্দ হয় তাদের। মাত্র ৪টি আসনে তারা ২য় স্থান দখল করে। বিষেশজ্ঞদের মতে নির্বাচনী বিপর্যয় পর্যালোচনা করলেও পার্টি সেই বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। নির্বাচনে তরুণ মুখকে স্থান দিলেও এখনও পার্টির অভ্যন্তরে বিভিন্ন সংগঠনে তরুণ মুখ দেখতে পাওয়া যায় না। 

তরুণ মুখ নির্বাচনে লড়লেও আসন সংখ্যা শূন্য হওয়ার বিষয়ে বাম ছাত্র সংগঠন ভারতের ছাত্র ফেডারেশন-এর (SFI) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাস বলেন, "নির্বাচন হল সংগঠনের সামগ্রিক অবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি। তরুণ মুখ সামনে আনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সংগঠনের সব স্তরে যতক্ষন কম বয়সী মুখ না আসছে ততক্ষন এর প্রতিফলন পাওয়া সম্ভব নয়"। অনেকের মতে কম বয়সীরা নির্বাচনে দাঁড়ালেও দলের নীতি নির্ধারণকারী কমিটি যেমন রাজ্য সম্পাদকমন্ডলী, রাজ্য কমিটি সেইসব জায়গায় এখনও এর প্রতিফলন নেই। যুব সম্প্রদায় কিভাবে ভাবছে অথবা কি পড়ছে তার প্রতিফলন যদি নীতি নির্ধারণের বিভিন্ন স্তরে প্রতিফলিত নাহয় তাহলে খুব একটা লাভ হবে না বলেই মনে করেন অনেকে। 

২০২১-এর নির্বাচনে বামেদের আরেক নতুম মুখ ছিল সৃজন ভট্টাচার্য। সিঙ্গুরের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসন, যে অঞ্চলের আন্দোলনের উপর নির্ভর করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে বাংলার মসনদে আসেন, সেই আসনে বামেরা প্রার্থী করে SFI-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যকে। সৃজনের মতে, "নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতি বামপন্থীদের পক্ষে সবটা ছিলনা। বিকল্প হিসেবে বামপন্থীরা উঠে আসতে পারেনি। তরুণ মুখের উপর ভরসা করলেই সব সময় ফল মিলবে তা নয়। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকাটা এই ফলের অন্যতম কারণ"। তিনি আরও বলেন, "বামপন্থী প্রার্থীদের দেখে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটি আশা আকাঙ্খা তৈরী হয়েছিল এটা ঠিকই কিন্তু সেটাই একমাত্র এক্স ফ্যাক্টর নয়। এই হারের দায় তরুণ প্রজন্মের ঘাড়েই শুধুমাত্র যেমন চাপান যায়না সেরকমই তরুণরা ভোট দাঁড়ালেই তার প্রতিফলন ভোটবাক্সে ঘটবে এমনটাও নয়। মানুষ বিভিন্ন জিনিস ভেবে ভোট দেয়, সেখানে বামপন্থীদের বিকল্প হয়ে উঠতে হবে "।

বামেদের আরেক তরুণ প্রার্থী দীপশিতা ধর প্রার্থী হন হাওড়ার বালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। তরুণ প্রজন্মের নির্বাচনে লড়ার পরেও বামেদের ভোটবাক্সে তার প্রভাব না পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, "২০১১ বা ২০১৬ সালের নির্বাচনে হারের ক্ষেত্রে, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে থাকার অভাব একমাত্র কারণ নয়। বামপন্থী রাজনীতিতে জাতি-ধর্ম-বয়সের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী। খেটে খাওয়া মানুষের পশে থাকার যে সংগ্রাম বামপন্থীরা করে সেই জাগায় খামতি যতদিন না পূরণ করা যাচ্ছে ততদিন শুধুমাত্র নতুন মুখের উপর ভরসা করে নির্বাচনে জেতা সম্ভব নয়"।  

অন্যদিকে বামেদের জোটসঙ্গী কংগ্রেসের (Congress) তরুণ নেতা এবং বিধাননগর কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রার্থী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, "নির্বাচনে তরুণ মুখের লড়াই ২০২১ সালে প্রথম নয়। প্রতিবারই একটি বড় অংশের প্রার্থীরা প্রথমবার নির্বাচনে লড়েন। সুতরাং তরুণ মুখের উপরে জোর দেওয়া এবং নির্বাচনে ফল ভালো না হওয়ার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করলে তা খুবই সরলীকরণ করা হবে। শুধুমাত্র আসন সংখ্যা শূন্য বলেই এই বিষয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে"। তিনি অন্যান্য রাজ্যের উদাহরণ দিয়ে বলেন বিহারে তেজস্বী যাদব নির্বাচনী প্রচারে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও সরকার গঠনে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে গুজরাটে হার্দিক প্যাটেল অথবা জিগনেশ মেবানির মত প্রার্থীরা জিতলেও অসাধারণ লড়াই করে হেরে যায় কংগ্রেস। তিনি শাসক দল তৃণমূলের উদাহরণ দিয়ে বলেন শাসক দলেও বহু তরুণ প্রার্থী এবার প্রথমবার লড়াই করে জিতেছেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ইমন কল্যাণ লাহিড়ী মনে করেন, "বামপন্থীদের থেকে বহুদিন আগেই গরিব মানুষের সমর্থন সরে গেছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুবই সফলভাবে বামপন্থী নারেটিভকে ধরে ফেলেছেন। এই মুহূর্তে শুধুমাত্র নির্বাচনে তরুণ প্রার্থী দিলেই হবেনা নেতৃত্বে তরুণ প্রজন্মকে তুলে আনা এবং তাদেরকে ভাবনার স্বাধীনতা দিতে হবে"।   

আরও পড়ুন: Nadia: সবুজ সাথীর সাইকেল বিক্রি করে দিচ্ছে বিজেপি নেতা! রণক্ষেত্র হাঁসখালি, গুলিবিদ্ধ ৪

২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর থেকে বামপন্থীদের ভোটব্যাঙ্কে ক্রমাগত ধস লক্ষ্য করা গেছে। ২০১১ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্ট (Left Front) মোট ৬২টি আসন দখল করে। এই নির্বাচনে বামফ্রন্টের সম্মিলিত ভোট ছিল ৪১%। এরপরে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামেদের আসন সংখ্যা হয় ২। রায়গঞ্জে জেতেন CPI(M)-এর পলিটব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম এবং মুর্শিদাবাদে জয়লাভ করেন বদরুদ্দোজা খান। মুর্শিদাবাদে ১৮,৪৫৩ ভোটে জয়লাভ করলেও, মহম্মদ সেলিম যেতেন মাত্র ১,৬৩৪ ভোটে।

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের তকমা হারায় বামফ্রন্ট। বিধানসভায় বিরোধী নেতা হন কংগ্রেসের আব্দুল মান্নান। হারান জমি ফেরত পেতে একদা রাজনৈতিক বিরোধী কংগ্রেসের সঙ্গে ২০১৬ সালে জোট করে বামফ্রন্ট। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ২টি কিন্তু বামেদের আসন কমে প্রায় ১৪টি। এছাড়াও ভোট শতাংশের হিসেবে কংগ্রেসের ভোট বৃদ্ধি পায় ৩.১৬% কিন্তু বামেদের ভোট কমে প্রায় ১০.৩৫%। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রথমবার বামেদের আসন সংখ্যা হয় শূন্য। অন্যদিকে মাত্র ২টি আসনে জয়লাভ করে কংগ্রেস। বামেদের ভোট কমে হয় ৬.৩৪%। এরপরে ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বাম এবং কংগ্রেস ২ দলই কোন আসন জিততে ব্যর্থ হয়। 

সুতরাং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালো প্রচার অথবা সুন্দর প্যারোডির মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরলেই তরুণ প্রার্থীরা সেই প্রচারের সুফল পাবেন এমনটা মনে করছেননা তরুণ বাম নেতৃত্ব। রাজ্যের মানুষের কাছে বিকল্প হিসেবে নিজেদেরকে তুলে ধরার ক্ষেত্রেই জোর দেওয়ার কথা ভাবছেন বামেদের তরুণ ব্রিগেড।

(Zee 24 Ghanta App দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির লেটেস্ট খবর পড়তে ডাউনলোড করুন Zee 24 Ghanta App)