ফিল্ম রিভিউ: মনুষ্য ধর্ম ও মানবতার গোত্রে দর্শকদের বাঁধতে সফল 'গোত্র'

রণিতা গোস্বামী

Updated By: Aug 24, 2019, 08:57 PM IST
ফিল্ম রিভিউ: মনুষ্য ধর্ম ও মানবতার গোত্রে দর্শকদের বাঁধতে সফল 'গোত্র'

রণিতা গোস্বামী

ছেলে অনির্বাণ কর্মসূত্রে থাকেন বিদেশে, আর মুক্তিদেবী থাকেন কলকাতায়। বিশাল গোবিন্দধাম ও রাধা-গোবিন্দের দায়িত্বভার একাই সামলাচ্ছেন মুক্তিদেবী। তাঁর সঙ্গী শুধু ঝুমা ও অন্যান্য কাজের লোকেরা। তবে বৃদ্ধা মায়ের দেখাশোনার জন্য উদ্বিগ্ন ছেলে অনির্বাণ কেয়ারটেকার হিসাবে নিযুক্ত করেন ৯ বছর জেল খেটে আসা, ইসলাম ধর্মালম্বী তারেখ আলিকে। যদিও তারেখ নয়, তারক বলেই তাঁর সঙ্গে মুক্তিদেবীর পরিচয় করান ছেলে অনির্বাণ। তবে ঘটনাচক্রে তারক যে আসলে তারেখ আলি তা জানতে পেরে যান মুক্তিদেবী। তারেখ ইসলাম ধর্মালম্বী হওয়া সত্ত্বেও সে কি মুক্তিদেবীর ছেলে হয়ে উঠতে পারবে? নাকি জাতপাত, ধর্ম, গোত্রই বাধা হয়ে দাঁড়াবে মা-ছেলের সম্পর্কে? এছাড়াও রয়েছে হাজারো বাধা, ও প্রমোটার শকুন বাপীর উৎপাত ও ষড়যন্ত্র। সব নিয়েই এগিয়েছে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালিত উইনডোজ প্রোডাকশনের নতুন ছবি 'গোত্র'র গল্প।

আরও পড়ুন-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মায়ের আদলেই তৈরি 'গোত্র'র মুক্তিদেবী: অনুসূয়া২৩ অগস্ট, শুক্রবার, জন্মাষ্টমীতে মুক্তি পেয়েছে এই ছবি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা হাজারও সমস্যা, ধর্ম, জাতপাত নিয়ে মিথ্যা দলাদলি, ঠুনকো, ঘুন ধরা ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধেই যোগ্য জবাব দিয়েছে 'গোত্র'। হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে জন্মাষ্টমী পালন করতে পারে না। মুসলিম হয়ে তারেখ জন্মাষ্টমীর ভোগ কিভাবে পরিবেশন করতে পারেন? এ প্রশ্ন যখনই উঠেছে তখনই যোগ্য জবাব দিয়েছেন মুক্তিদেবী। তিনি শিখিয়েছেন 'ধর্ম সেটাই যা আমরা ধারণ করি'। তিনিই জানিয়েছেন আলিগড়ে শুধু হিন্দুরা নয়, রাধা-কৃষ্ণের পিতলের মূর্তি তৈরি করেন মুসলিমরাও। এদেশের বেশকিছু এমন দরগা রয়েছে যেখানে জন্মাষ্টমী পালিত হয়। আবার যাঁরা মুসলিমদের হাতে ভোগ খাওয়া নিয়ে আপত্তি তুলছেন, সেই তাঁরাই কিন্তু আরসালানের বিরিয়ানি খেতেই সব থেকে বেশি ভালোবাসেন। কোনও সম্পর্কের মাঝেই যে জাতপাত কিংবা গোত্রকে আনা যায় না তা বেশ ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের এই ছবি।

শুধু তাই নয়, ধর্ম ও সম্পর্ককে গুলিয়ে ফেলে কারোর মনে যদি কোনও ভ্রান্ত ধারনা থেকেও থাকে, এই ছবি দেখলে সেই ধারনা বদলে যেতে বাধ্য একথা হলফ করে বলা যায়। তবে শুধু ধর্ম বা গোত্র নয়, এ শহর যে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য নিরাপদ নয়, কিংবা শহরে রমরম করে চলা প্রমোটার চক্রের কথাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই ছবি। 

অভিনয়ের কথা বলতে গেলে এই ছবি মুক্তিদেবীর ভূমিকায় অনুসূয়া মজুমজার এককথায় অনবদ্য। মন কেড়েছে নাইজেল ও মানালি জুটিও। এছাড়াও খরাজ মুখোপাধ্য়ায়, অম্বরিশ ভট্টাচার্য, বাদশা মৈত্র, সন্তু মুখোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ বসু প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভূমিকায় অসাধারণ। ছবির বিষয়বস্তু গুরু গম্ভীর হওয়া সত্ত্বেও ছবিতে ব্যবহৃত হাস্যরস কোথাও ছবিটিকে একঘেয়ে করে তোলেনি। মন কেড়েছে ছবিতে শ্রেয়া ঘোষালের গাওয়া 'বৈষ্ণব জন তো'র বাংলা ভার্সান। আলাদা করে মন ছুঁয়ে যায় অদিতি মুন্সির গাওয়া কীর্তনটিও। ছবিতে জন্মাষ্টমী পালনের দৃশ্য দর্শকদেরও একাত্ম করে তোলে। ছবিটি দেখতে দেখতে বিদেশে থাকা ছেলের জন্য মুক্তিদেবীর মন কেমন যেমন দর্শকাসনে বসে থাকা বৃদ্ধা মানুষটির চোখ ভিজিয়েছে, তেমনই রঙ্গবতীর সুরে নেচে উঠেছেন অল্পবয়সী দর্শকরাও। এমনকি বেশকিছু সংলাপে জন্য সিনেমা হলে সিটি বাজাতেও শোনা গেছে বেশকিছু দর্শককে। তবে ছবির প্রথমার্ধের থেকে দ্বিতীয়ার্ধটা একটু বেশি দীর্ঘ মনে হয়েছে।

জাতপাত নিয়ে সমাজের গুরুতর সমস্যার প্রতিবিম্ব তুলে ধরার জন্য আয়না হয়ে উঠতে সফল শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের 'গোত্র'। সব মিলিয়ে এই ছবিতে ৫ এর মধ্যে ৪ দেওয়াই যায়। 

আরও পড়ুন-অন্ধকার থেকে আলোর দিশা দেখাচ্ছেন, নাইজেলই উদাহরণ: মানালি

.