শুরু করেছিলেন শরৎচন্দ্র, ১৫০ বছর পরেও বলতে হচ্ছে, 'বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও'

সৌমিত্র সেন

Updated By: Sep 17, 2020, 04:03 PM IST
শুরু করেছিলেন শরৎচন্দ্র, ১৫০ বছর পরেও বলতে হচ্ছে, 'বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও'

সৌমিত্র সেন

সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালির জীবনে ২৫ বৈশাখের মতোই আর একটি বিশেষ বাংলা তারিখ হল ৩১ ভাদ্র। সেই ৩১ ভাদ্র আজ। অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। যিনি বরাবরের বেস্টসেলার। কিংবা ঘুরিয়ে বলা চলে, প্রায় দেড়শো বছর আগেই যিনি অনায়াসে প্রথম দেশীয় সাহিত্যে আজকের এই বেস্টসেলারের ধারণাটার জন্ম দিয়েছিলেন।  

দিনটির ক্ষেত্রে একটি অন্যরকম সমাপতনও ঘটে গেল আজ। আজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীরও জন্মদিন। না, এটা অবশ্য সমাপতন নয়। সেটা  অন্য জায়গায়। 'বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও' যোজনা এনে 'উওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট'কে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ফলাও করে দাবি করে যে বিজেপি সরকার সেই সরকারেরই মুখ নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনের দিনই এ দেশের সাহিত্যে নারীকণ্ঠকে প্রথম জোরদার ভাবে যিনি তুলে ধরেন সেই শরৎচন্দ্রেরও জন্মদিনটি পড়ল! সমাপতন নয়?

অথচ, নিজের সময়ে শরৎচন্দ্র এ নিয়ে কোথাও কোনও রকম আত্মজাহির করেছিলেন বলে কখনও শোনা যায়নি। যদিও তাঁর সাহিত্যে 'অবলা'মেয়েদের কখনও সবাক দেখে, প্রতিবাদী দেখে, কখনও অত্যাচারিত দেখে, নিপীড়িত দেখে সমাজের এক শ্রেণির মানুষ মেয়েদের প্রকৃত জগৎটা চিনতে শিখেছে, বুঝেতে শিখেছে, সম্মান করতেও শিখেছে। উপন্যাসের কাঠামোয় নারীবাদী এই বদলটা আনার জন্য তাঁকে খাটতেও হয়েছিল প্রচুর। মাটির কাছাকাছি থাকা বাঙালি পরিবারগুলিকে সহমর্মিতার চোখ দিয়ে দেখতে শিখতে হয়েছিল। তাঁর উপন্যাসের এই সব নারীচরিত্রের অধিকাংশই তো সাধারণ বাঙালি ঘরের অতি সাধারণ মেয়ে। অথচ তাঁদের নিয়েই তিনি কতদিন আগে উপন্যাসিকের দেখার ভঙ্গিটাই পুরোপুরি বদলে ফেললেন। তাঁর 'চরিত্রহীন', 'পল্লীসমাজ', 'গৃহদাহ', 'শ্রীকান্ত'  উপন্যাসগুলিতে এরকম কত নারীচরিত্র যে কতভাবে পাঠককে ভাবিয়েছে, কাঁদিয়েছে, উৎসাহিত করেছে, স্বপ্ন দেখিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই!

অথচ এর জন্য কম মূল্যও দিতে হয়নি শরৎচন্দ্রকে, শরৎসাহিত্যকে। বাংলাসাহিত্যের তথাকথিত বাঘা বাঘা সমালোচকদের 'স্কুল' তাঁকে ধরে সটান বাঙালির রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। শরৎসাহিত্যও শেষমেশ তাঁদের 'উদ্যোগে'ই ভাতের হাঁড়িতে ঠাঁই পেয়ে এসেছে। তথাকথিত এলিট তকমা শরৎচন্দ্র কোনও দিনই পাননি। পাননি সেই অর্থে যোগ্য সমাদর বা সম্মাননাও। বরাবর তাঁকে একটু একঘেয়ে একপেশে দেগে দিয়ে একধারেই ঠেলে রাখা হয়েছে। 

অথচ পাঠক কৌলীন্যে যদি কোনও লেখকের মূল্যায়ন হয়, তবে বলতেই হয় বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক বোধ হয় শরৎচন্দ্রই। আর শুধু বাংলা সাহিত্যই বা বলি কেন? এ ক্ষেত্রে ভারতীয় সাহিত্য বলাটা সম্ভবত ভুল হবে না। কেননা, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষত দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু রাজ্যের এমন এমন জায়গাও আছে, যেখানে সেই অঞ্চলের স্থানীয় ভাষার পাঠক শরৎচন্দ্রকে তাঁদের নিজের ভাষার লেখক হিসেবেই জেনে বড় হয়েছেন। এবং পরে হঠাৎ কোনও একদিন ভুল ভেঙে তিনি আশ্চর্য হয়ে জেনেছেন, শরৎচন্দ্র একজন পুরোদস্তুর বাঙালি লেখক! এ তথ্যে বাঙালিরই বুকের ছাতি ৩৬ ইঞ্চি হওয়ার কথা। কিন্তু হয়েছে কি?

অন্য একটা ক্ষেত্রে অবশ্য শরৎচন্দ্র চিরকালের চ্যাম্পিয়ন। ফিল্মিদুনিয়া। কি বলিউড, কি টলিউড সর্বত্রই তিনি বরাবর সপাটে ব্যাটিং করে এসেছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের একেবারে প্রথম লগ্ন থেকেই শরৎচন্দ্র পরিচালকদের প্রভূত কৌলীন্য পেয়ে এসেছেন। তাঁর বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস সাফল্যের সঙ্গে সেলুলয়েড-বন্দি হয়েছে। একই কাহিনি বিভিন্ন নামে বাংলা ও হিন্দিতে হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে 'দেবদাস' তো রেকর্ড গড়ে ফেলেছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় 'দেবদাস'-এর মোটামুটি ষোলোটি ভার্সান তৈরি হয়েছে! আরও কত হবে, কে জানে!

অবশ্য দুঃখটাও এখানেই। নতুন প্রজন্ম শরৎবাবুকে তত জানে না, যত জানে দেবদাসকে। দেবদাসের জীবনভর ট্র্যাজেডি যে অন্য ভাবে তাঁর স্রষ্টাকেও এভাবে বরাবর ছুঁয়ে থাকবে, কেউ অনুমান করতে পেরেছিল কোনওদিন!