সূর্যোদয়ের পর প্রস্তর বিগ্রহের অঙ্গরাগ, চারচালা মন্দিরের গর্ভৃগৃহে কালিকারূপী দেবী নলাটেশ্বরী

প্রস্তর মূর্তির উচ্চতা প্রায় চার ফুট। সিঁদুরে রাঙানো মুখমণ্ডল। মাথার ওপর চাঁদির ছাতা। সুদীর্ঘ ভ্রু। দেবীর এখানে ত্রিনেত্র অর্থাত্‍ তিনটি চোখ। দুদিকে দাঁতের মধ্যস্থলে সোনার তৈরি বিশাল জিহ্বা। 

Updated By: Nov 12, 2020, 09:57 AM IST
সূর্যোদয়ের পর প্রস্তর বিগ্রহের অঙ্গরাগ, চারচালা মন্দিরের গর্ভৃগৃহে কালিকারূপী দেবী নলাটেশ্বরী
নিজস্ব চিত্র

ধ্রুবজ্যোতি অধিকারী, কমলাক্ষ ভট্টাচার্য: মানুষের তীর্থেই ঈশ্বরের আসন পাতা। তাই মন্দির দর্শনেরও আগে মানুষ দর্শন। কার্তিক মাসের সকাল। রোদ উঠলেও, বীরভূমের এদিকটায় বাতাসে এখন থেকেই ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। উনুনে অগ্নি, জঠরেও অগ্নি। গরম তেলে পানসি নৌকার মতো কচুরি ভাসতে দেখে পাড়ার মন্দিরে প্রসাদ বিতরণ করা এক জেঠুর কথা মনে পড়ে গেল। তিনি ছোটদের হাতে প্রসাদ দিয়ে বলতেন, মনে রাখবি, মা বলেছে খাওয়াদাওয়া মূল, বাকি সব ভুল। অতএব রামপ্রসাদী গানের কলি আওড়ে বসে পড়া --- আহার করো, মনে করো, আহুতি দিই শ্যামা মাকে। 

ভ্রমিতে চাহি আমি সুন্দর ভুবনে। কথাটা আরশিতে ফেলে দেখতে গিয়ে তাজ্জব। দেখি, লেখা রয়েছে, মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। এই চাওয়া আর না চাওয়ার মাঝে যদি একটা আনন্দের ধ্বনি বেজে থাকে, বাজুক না...। আবার মনে পড়ছে কালকূটের কথা। অতিমারীর আবহে এতদূর এসে আরও বেশি উপলব্ধি করা যাচ্ছে এর অর্থ। আর এসব ভাবতে ভাবতেই নলহাটি পৌঁছে যাওয়া। বীরভূমের রামপুরহাট মহকুমা থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে, ঝাড়খণ্ড সীমানার কাছে নলহাটি শহর। আর এখানেই বিরাজ করছেন দেবী নলাটেশ্বরী। 

আৎও পড়ুন: হেমন্তের আকাশপ্রদীপ মিলে গেল চূর্ণীর ঘিয়ের প্রদীপে

নলাটেশ্বরী মন্দিরের স্থাপত্যশিল্প বহু প্রাচীন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে মন্দিরের গায়ে রয়েছে গুপ্ত স্থাপত্যের নিদর্শন। চারচালা মন্দিরের গর্ভৃগৃহে প্রস্তরখণ্ডে কালিকারূপী দেবী নলাটেশ্বরী। প্রস্তর মূর্তির উচ্চতা প্রায় চার ফুট। সিঁদুরে রাঙানো মুখমণ্ডল। মাথার ওপর চাঁদির ছাতা। সুদীর্ঘ ভ্রু। দেবীর এখানে ত্রিনেত্র অর্থাত্‍ তিনটি চোখ। দুদিকে দাঁতের মধ্যস্থলে সোনার তৈরি বিশাল জিহ্বা। 

মূল মন্দির নির্মাণ করান নাটোরের রানী ভবানী। মুর্শিদাবাদের নসিপুরের দেবী সিংহের পত্নী রানি সূর্য কুমারীর নামে ছিল দেবোত্তর সম্পত্তি। এখন ট্রাস্টি কমিটি পুজো পরিচালনা ও  সব কাজ দেখাশোনা করে। মন্দিরের উত্তর দিকে রয়েছে পঞ্চমুন্ডির আসন। ১২৯৬ সালে জনৈক স্বামী কুশলানন্দ ব্রহ্মচারী কাশী থেকে প্রথমে তারাপীঠে আসেন। সেখান থেকে নলহাটিতে এসে পঞ্চমুন্ডি আসন প্রতিষ্ঠা করে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। মন্দিরের উত্তরে সেই সিদ্ধাসন আজও বর্তমান। 

অতীতের নলহাটি আর কালিন্দিপুর গ্রাম নিয়ে আজকের নলহাটি শহর। ছোটনাগপুর মালভূমির গন্ধ মাখা এই ভূখণ্ড বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সনাতন ভারতের আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে যুক্ত নলাটেশ্বরী মন্দির। শক্তিপীঠের মাহাত্ম্য কথার সঙ্গে জড়িয়ে ছোট ছোট কাহিনি। পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পশ্চাদপট। আর রয়েছে বহু রকম জনশ্রুতি। দেবী নলাটেশ্বরীর পুজোর প্রধান উপকরণ চাঁছি ও পেঁড়ার সন্দেশ। প্রতিদিন সূর্যোদয়ের পর প্রস্তর বিগ্রহের অঙ্গরাগ হয়। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। বর্তমান মন্দিরে আধুনিকতার ছাপ লেগেছে।  সন্ধে হতেই এলইডি আলোয় সেজে ওঠে দেবীগৃহ। অন্ধকার যত গাঢ় হয়, তত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে হোমের অগ্নিশিখা। মাতৃনামে মুখর নলাটেশ্বরী মন্দির।