close

News WrapGet Handpicked Stories from our editors directly to your mailbox

পায়ে পায়ে চাঁদে পা পঞ্চাশে

চাঁদে আদৌ মানুষ পা দেয়নি, গোটাটাই স্পেশাল এফেক্টের কারসাজি, শ্যুটিং, এই তত্ত্ব বিশ্বাস করেন অনেকেই।

Updated: Jul 19, 2019, 06:39 PM IST
পায়ে পায়ে চাঁদে পা পঞ্চাশে

সব্যসাচী চক্রবর্তী : বহু মাইল পার করে আসা যন্ত্রটি থেকে নামলেন তিনি। বুট স্পর্শ করল ধুলো ভরা মাটি। ধুলো চলকে উঠল কিছুটা। বুকের ধুকপুক তাঁর গেল আরও বেড়ে। তিনিই তবে প্রথম যিনি এভাবে, এখানে! সময় ইস্টার্ন টাইম জোনে, রাত ১০.৫৬। আর তারিখ, ১৯৬৯, ২০ জুলাই। 

দূরে চোখ গেল তাঁর। ওই দূরে। নীল গ্রহটা স্থির যেন। তাতে সাদাটে ছোপ ছোপ। ওইখানে, ওইখানে থাকি আমরা! বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই চায় না। এত দূরে, এভাবেও আসা সম্ভব! 

সম্ভব তো। অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন অ্যাপলো ১১-এর কমান্ডার নীল আর্মস্ট্রং। সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত কমান্ড মডিউল পাইলট মাইকেল কলিন্স আর লুনার মডিউল পাইলট বাজ অলড্রিনের। সে ঐতিহাসিক মুহূর্তের পঞ্চাশ বছর পূর্তি। 

আরও পড়ুন-  আগামী সোমবারই পাড়ি দিচ্ছে চন্দ্রযান-২, জানাল ইসরো

এই ঐতিহাসিক সাফল্য হয়ত এভাবে আসত না, যদি না ঠাণ্ডা যুদ্ধের কম্পিটিশন জাঁকিয়ে বসত। রাশিয়া, থুড়ি সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা। দুই দেশের গুঁতোগুঁতি সেই সময় তুঙ্গে। ফলে মানবতার স্বার্থে বা বৈজ্ঞানিক ভাবনার দোহাই নিয়ে এক মহান মিশন কিছু সেদিন হয়েছিল তা ভাবার কোনও কারণ নেই। এটা স্রেফ দুই দেশের মহাকাশ দৌড়ের ফসল। আর কিচ্ছু না। নাসা অ্যাডমিনস্ট্রেটর জিম ব্রিডেনস্টাইনও কদিন আগে একটি ইন্টারভিউতে বলেছেন, সেই সময় সদ্য ক্ষমতায় এসেছেন জন এফ কেনেডি। ক্ষমতায় এসেই রাশিয়ার দৌড় ভাল করে লক্ষ্য করেছেন, তারপরেই মিশন শেষ করার সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। আর তাতেই কাজ হয়েছে। জিমের মতে, কেনেডি এই চাপ না দিলে ভাবনার জায়গাতেই রয়ে যেত সবকিছু। শেষে সাফল্য এসেছিল। আবারও নিজেদের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

“It will not be one man going to the moon, It will be an entire nation. For all of us must work to put him there.” –John F Kennedy 

দুর্ভাগ্যের বিষয়, চাঁদে পা রাখার ঐতিহাসিক এই ঘোষণার বাস্তব রূপ দেখে যেতে পারেননি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কেনেডি। 

বেশ কয়েক বছর আগেই, ১৯৬৩-তে খুন করা হয় তাঁকে। তবুও, দুঃসাহসিক এই চন্দ্র মিশনে, ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে কেনেডির নাম। 

আসলে বাষট্টি সালে কিউবার মিসাইল সংকট নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার চাপানউতোর একেবারে তুঙ্গে। ঠাণ্ডা যুদ্ধ চরমে পৌঁছয় সে বছরেই। পরিস্থিতি এমন, যে হাতাহাতি লাগল বলে। পরের বছরেই অবশ্য দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কেনেডি আর ক্রুশ্চেভ পরমাণু অস্ত্র সীমিত করার চুক্তি সই করেন। এরপরেই ঠিক যুদ্ধ যুদ্ধ নয়, বরং দেখনদারির দিকে চলে যায় দুই দেশ। 

তবে আরেকটা মোচড় আছে গল্পে। এই অ্যাপলো মিশন কিন্তু আসলে শুরুতে দুই দেশের মধ্যে চাপানউতোর কমানোর জন্যই। 

সোভিয়েত আর আমেরিকা একসঙ্গে কাজ করবে এই মিশনে, এরকমই একটা ভাবনা ছিল স্বয়ং কেনেডির। কিন্তু তারপর ঝগড়া আরও বাড়ে। বাড়ে অস্ত্র দৌড়। ইগোতে নিয়ে নেয় আমেরিকা। তার ওপর সাতান্ন সালে প্রথম আর্টিফিসিয়াল স্যাটেলাইট স্পুটনিক মহাকাশে ভাসিয়ে এবং ভস্তক মহাকাশ যানে প্রথম নভশ্চর হিসেবে মহাকাশে ইউরি গ্যাগারিনকে পাঠিয়ে বেশ কলার চড়িয়ে রেখেছিল সোভিয়েত। শুধু কী তাই, তেষট্টিতে প্রথম মহিলা নভশ্চর, রাশিয়ার ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা। সোভিয়েতের তো আঙুল ফুলে কলাগাছ। আর হিংসেয় জ্বলে পুড়ে মরছে আমেরিকা। কেনেডি নিহত হওয়ার পর অ্যাপোলো নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা হয়নি দুই দেশের। কেনেডির মৃত্যুর পর, একলা চলোর নীতি নেয় আমেরিকা। 

আরও পড়ুন-  FaceApp-এর সাহায্যে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতাচ্ছে রুশ সংস্থা!

সাতষট্টিতে এই অ্যাপোলো মিশনেই ঘটল দুর্ঘটনা। প্রশিক্ষণ চলাকালীন আগুনে পুড়ে মৃত্যু হল তিন নভশ্চর গুস গ্যারিসন, এড হোয়াইট আর রজার চ্যাফের। বিপর্যয়ের অপমানে জেদ আরও বাড়ল আমেরিকার। চন্দ্রাভিযান, আমেরিকার ইগোর মিশনে দাঁড়িয়ে গেল, এবং সফল হল। এবং, তৈরি হল ইতিহাস। যে ইতিহাসের পেছনে ছিল কেনেডির দিয়ে যাওয়া নির্দেশ। এবং নাসার চার লক্ষ বিজ্ঞানীর নিরলস পরিশ্রম। 

আর এখানেই প্রশ্ন ওঠে, ইতিহাস তো তৈরি হল। কিন্তু তার পদাঙ্ক আর অনুসরণ হল না কেন?  গত পঞ্চাশ বছরে, আর কোনও মানুষ কেন চাঁদে পা রাখল না? এরপর  চাঁদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করেছেন অন্তত চব্বিশজন নভশ্চর। কিন্তু কেন, চাঁদের বুকে পা পড়ল না আর কারওর? কোনও দেশ উদ্যোগী হল না? 

প্রশ্ন জোরদার হয় যত, তত ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব জমাট বাঁধে। 

চাঁদে আদৌ মানুষ পা দেয়নি, গোটাটাই স্পেশাল এফেক্টের কারসাজি, শ্যুটিং, এই তত্ত্ব বিশ্বাস করেন অনেকেই। খোদ মার্কিনিদের অনেকেই এই ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব মানেন। এছাড়াও চাঁদে এলিয়েনরা থাকে, চাঁদ আসলে চাঁদ নয়, গোপন সামরিক ঘাঁটি, কয়েক ধাপ এগিয়ে এই গপ্পোও ছড়িয়েছে বেশ। যাই হোক, এইসব ছেড়ে আসল কারণ খোঁজ করা যাক। 

শুরুতে একটা বিষয় ভালো করে বুঝে নিন। অ্যাপোলো মিশন আসলে বিশাল কোনও মহাকাশের রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে কাজ করেনি। এটা স্রেফ রাজনীতি। আমেরিকায় স্পেস একটা বড়সড় পলিটিক্যাল এজেন্ডা। যে কালচার এদেশেও তৈরি করছেন নরেন্দ্র মোদী। চন্দ্রায়ন ২ থমকে আছে বটে। আবার বাইশ তারিখ উড়বে সে। যাই হোক, আমেরিকার আগে চাঁদে নিজেদের পতাকা ওড়ানোর পরিকল্পনা ছিল সোভিয়েতের। আমেরিকা গোল দিয়েছে। ফলে লক্ষ্য ইতিমধ্যেই অর্জন করা হয়ে গিয়েছে, তা নতুন করে আর ঘাঁটাতে চায়নি তারা। ঔচিত্যের জায়গা থেকে আমেরিকা আর চেষ্টা করেনি মানুষ পাঠানোর। তার ওপর খরচ বড় ফ্যাক্টর। মহাকাশে মানুষ পাঠানো সবথেকে ব্যয়বহুল মিশন। চাঁদে পাঠানো হলে তো আরও। সেই টাকায় কাজে লাগবে এমন স্যাটেলাইট হয়ে যাবে। ফলে আমেরিকা যখন মানুষ পাঠিয়েই দিয়েছে, তখন আর সেই জুতোয় পা গলিয়ে ‘বেফালতু’ খরচের রাস্তায় যেতে চায়নি কোনও দেশ। 

আরেকটা বড় কারণ হল স্পেস ওয়ার। বেশিরভাগ দেশেরই পৃথিবী ছাড়ায়ে কী আছে, তা খোঁজ করার ধৈর্য নেই। হ্যাঁ, গবেষণা চলছে, চলবে, তার জন্য রাষ্ট্রও পাশে থাকবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই অ্যাপোলো মিশনের মতো, পাখির চোখ করে চাঁদের মানুষ পাঠানোর মতো ইচ্ছে নেই আর কোনও রাষ্ট্রের। তার চেয়ে বরং কীভাবে অন্য রাষ্ট্রের স্যাটেলাইট ধ্বংস করে নিজের আখের গোছানো যায়, কিংবা তাতে নজরদারী চালানো যায়, অথবা আরও শক্তিশালী নিজেদের স্যাটেলাইট বানানো যায়, সে দিকেই বেশি নজর। 

স্পেস ওয়ারে আমেরিকা, রাশিয়াকে ছাপিয়ে চিন দাদাগিরির পথে। ভারত সদ্য সে আস্ফালনওয়ালা ক্লাবে নাম লিখিয়েছে। দু হাজার বাইশে মহাকাশে মানুষ পাঠানোর বিষয়টিও মাথায় আছে মোদী সরকারের। কিন্তু আলাদা করে চাঁদের মাটিতে পা ঠেকানো নিয়ে এখনও পর্যন্ত বিশাল তোড়জোড় আর নেই। বরং টেসলার মতো বেসরকারি স্পেস এজেন্সিগুলো এই নিয়ে কিছু ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। সুতরাং, চাঁদে আদৌ মানুষ পাঠানো হয়েছে কি না, সে কারণেই এই উদ্যোগ নেই কি না,  সে সব তর্ক চলতেই থাকবে। তর্ক চলবে, চাঁদে হাওয়া নেই তাও কেন পতাকা উড়ছে কিংবা আমস্ট্রংয়ের ছবিটা কে তুলল তা নিয়েও। 

তবে সেলিব্রেশন চলছে। গোটা বিশ্ব উদযাপন করবে এই পঞ্চাশ বছরের। আমেরিকা তো বটেই। সেখানে চলবে স্পেস পার্টি। সেলিব্রেশন করবে নাসাও। 

উৎসবে সামিল হবেন মাইকেল কলিন্স। অষ্টআশি বছর বয়স এখন তাঁর। যেখান থেকে তাঁদের চন্দ্রযান আকাশে পাড়ি দিয়েছিল, সেই ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে যাবেন তিনি। কলিন্সের অবশ্য চাঁদে পা দেওয়া হয়নি। যাঁরা দুজন গিয়েছিলেন, তার মধ্যে আর্মস্ট্রং চলে গিয়েছেন ২০১২ সালে। আর বাজ অলড্রিন, আসবেন না। নিজের মতো করে হয়ত মনে করবেন এই দিনটাকে। তবে আমস্ট্রংয়ের স্পেস স্যুটটি জনসমক্ষে আনা হবে। রাখা থাকবে ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামে।  

কদিন আগেই, কলিন্স জানিয়েছিলেন পৃথিবী ছাড়িয়ে ওড়ার অভিজ্ঞতা। "We crew felt the weight of the world on our shoulders, we knew that everyone would be looking at us, friend or foe." 

এখনও তো তাকিয়েই আছি আমরা। হলদে পূর্ণিমায় যখন পুরো গোল চাকতি হয় চাঁদ, মনুষ্যচিত ঔদ্ধত্যে আঙুল তুলে বলাই যায়, বুকে পা রেখেছি তোমার। স্মৃতি চিহ্ন বয়ে চলো আমরণ। ধূ ধূ ধুলোর চাঁদের পিঠে এখনও কি উড়ছে মানুষের সে পতাকা? আর পায়ের ছাপ? হারিয়েছে নিশ্চয়ই! পুরু ধুলোর আস্তরণে আর কি কারওর পায়ের ছাপ পড়বে? উত্তরটা তোলা থাকুক। সেলিব্রেশন চলুক বরং..